বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: টানা তিন কার্যদিবসে বড় উত্থানের পর বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) দেশের শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৬৬ কোম্পানির শেয়ার দামের সর্বনিম্ন সীমা বা ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় এই দরপতন হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিএসইসির এ নির্দেশনার পরই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককেন্দ্রীক শেয়ারবাজার সম্পর্কিত গ্রুপগুলোতে। সেখানে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, গত বছরে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর সময়ে বাজারে ব্যাপক দরপতন হয়। এতে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। আর সে সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সাবেক কমিশন সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেষ পুঁজিটুকু বাচাতে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেন। এতে হয়তো ওইসব শেয়ারের পতন ধরে রাখা গিয়েছে, তবে সেই লোকসান গত এক বছরেও পুষিয়ে নিতে পারেননি তারা। কারণ এই এক বছরে বাজার সূচক ও লেনদেনের দৃশ্যমান বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

বৃহস্পতিবারের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬৬টি কোম্পানির মধ্যে লেনদেন হওয়া ৬৩টির মধ্যে ৬১টির আজ দর পতন হয়েছে। আর নাভানা সিএনজির দর বেড়েছে ও আরএন স্পিনিংয়ের দর অপরিবর্তিত রয়েছে। বাকি ৩ কোম্পানির শেয়ার রেকর্ড ডেট ও স্থগিতাদেশের কারনে লেনদেন হয়নি। এরমধ্যে রেকর্ড ডেটের কারনে গোল্ডেন হার্ভেস্টের শেয়ার আজ লেনদেন বন্ধ ছিল। এছাড়া বিডি সার্ভিসের শেয়ার দীর্ঘদিন ধরে বিক্রেতা না থাকায় লেনদেন হয় না এবং পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ করে রেখেছে স্টক এক্সচেঞ্জ।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, করোনা ও লকডাউন ইস্যুতে বিনিয়োগকারীরা যখন আতঙ্কিত, ঠিক তখনই  বিএসইসি ফ্লোর প্রাইস তুলে নিয়েছে। তারা বলছেন, বাজারে যখন লেনদেন ১৫০০-২০০০ কোটি হচ্ছিল এবং সূচকে তেজিভাব ছিল, ওইসময় ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া যেত বলে অনেকে মনে করেন। আর এই মুহুর্তে তুলে নেওয়াটাকে খামখেয়ালি বলেই মনে করছেন অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ফ্লোর প্রাইসের কারণে ওই ৬৬ কোম্পানির শেয়ার তেমন লেনদেন হচ্ছিল না। বাজারে লেনদেনের গতি বাড়ানোর জন্য হয়তো বিএসইসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এমনিতেই এখন একটি ক্রান্তিকাল যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি যেকোনো বিষয় বাজারে পেনিক সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিএসইসির উচিত ছিল আরও সময় নিয়ে ফ্লোর প্রাইস তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া।

তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন কথা বলছেন ডিএসই’র পরিচালক শাকিল রিজভী। বিজনেস জার্নালকে তিনি বলেন, শেয়ারবাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। বিশ্বের কোথাও পুঁজিবাজারকে এভাবে থামিয়ে রাখার নজির নেই। তিনি বলেন, শেয়ার কেনা-বেচাই পুঁজিবাজারের কাজ। যদি কেনা-বেচাই বন্ধ করে দেয়া হয়, তবে তা বাজারের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এমনতো না যে আজ কমলে তা কাল বাড়বে না। এর আগেওতো বাজার সূচক ৪ হাজারে চলে গিয়েছিল, পরবর্তীতে তা আবার ঠিকই বেড়েছে।

তবে সিদ্ধান্তটি আরও আগে নিলে ভালো হতো মন্তব্য করে তিনি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আতঙ্কিত না হয়ে শেয়ার বিক্রি করা ঠিক না। কোম্পানির পারফরমেন্স ঠিক থাকলে শেয়ারের বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তা ককরার কোন কারণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত তৈরি করে ফ্লোর প্রাইস। যে কোম্পানি লেনদেন হওয়ার কথা, সেটি লেনদেন হচ্ছে না। আর হলেও সেই কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ছে না। এসব কোম্পানির শেয়ার যেসব বিনিয়োগকারীর কাছে আছে তারা পারছেন না শেয়ার বিক্রি করতে। কারণ যে দরে ফ্লোর প্রাইস ধরা হয়েছে সে দরে কেউ কিনতে চান না।

তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেওয়ায় সে কোম্পানিগুলোর এখন হয় শেয়ারের দর বাড়বে নাহয় কমবে। বিনিয়োগকারীরা স্বাধীনভাবে তাদের শেয়ার লেনদেন করতে পারবে। লকডাউনের মধ্যে টানা তিন দিন সূচকের উত্থান হয়েছে। এক-দুই দিন কমবে। এটাই স্বাভাবিক। সূচক পতন হয়েছে বলে যেসব বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে আছেন তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশীদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসি কারসাজি চক্রের পাতানো ফাদে পা দিয়েছেন। যারা এতোদিন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করতে ফ্লোর প্রাইস উঠানোর জন্য নানামহলে ঘুরাফেরা আর তদবির করে আসছিলেন তারা আজ সফল। বিএসইসি নিজেই তাদের সেই পথ তৈরী করে দিলো।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে বিএসইসির চেয়ারম্যান নিজেই বলে আসছিলেন যে, বাজার যতদিন স্ট্যাবল না হবে ততোদিন ফ্লোর প্রাইস উঠানো হবে না। তবে আজ কি ওনার কাছে বাজারকে স্ট্যাবল মনে হচ্ছে? কিভাবে এবং কোন কারনে তা আমার বোধগম্য নয়।

মিজান-উর-রশীদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাচাতে ফ্লোর প্রাইসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর কমিশন তথাকথিত কারসাজি মহল তথা মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই বাজার এই দুঃসময়ে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছেন- যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
এ সময় তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আমি মনে করি বাজার সূচক ১০ হাজারে না যাওয়ার আগে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা উচিত হয়নি।

বাংলাদেশ সম্মিলিত পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও আইসিবি ইনভেস্টরস ফোরামের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট রুহুল আমিন আকন্দ বলেন, বিষয়টি বাজারের জন্য অশনি সংকেত। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাবেক কমিশন বাজারের স্থিতিশীলতায় ফ্লোর প্রাইসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান কমিশন ঠিক কি কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বনাশী এমন সিদ্ধান্ত নিল, তা আমার মাথায়ও ঢুকছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, মানলাম সারাজীবনতো ফ্লোর প্রাইস রাখা যাবে না, কোন এক সময়তো এটাকে উঠাতেই হবে। সেক্ষেত্রে বিএসইসি ৬৬টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার না করে পরীক্ষামূলক ৫-১০টার প্রত্যাহার করে দেখতে পারতো। তবে তিনি মনে করেন বাজার তথা বাজারের প্রাণ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ চিন্তা করলে বিএসইসি কখনোই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

জানতে চাইলে লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী পলাশ আহমেদ বলেন, বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের কারণেই বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেসব কোম্পানি সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের পুঁজি নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ বাজারের আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় ফ্লোর প্রাইসে থাকা অনেক কোম্পানিরই ক্রেতা ছিল না। পরিণতিতে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে এসব কোম্পানির শেয়ার বিক্রির জন্য দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

পলাশ আরও বলেন, দ্বিতীয় ধাপে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকা এবং লকডাউন ইস্যুতে এমনিতেই বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন, তার উপরে বিএসইসির এমন সিদ্ধান্তকে ‘মরার উপরে খাড়ার ঘা’ হিসেবে মনে করেন তিনি। সেই সাথে বাজারের এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কার স্বার্থে বিএসইসি হঠাৎ ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের মতো এমন সর্বনাশা সিদ্ধান্ত নিলো, তা আমার বোধগম্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকা/এইচকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here