বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদকঃ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শেয়ারের দরপতনের দিনে দাপট দেখিয়েছে বিমা খাত। আর তাতে পাল্টে গেল পুঁজিবাজারের চিত্র। দিনভর সূচকের ওঠানামা শেষে সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার (১৯ এপ্রিল) দেশের পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেন বেড়েছে।

এদিন দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক বেড়েছে ১৮ পয়েন্ট। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক বেড়েছে ৬১ পয়েন্ট। সূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেন আগের দিনের চেয়ে ৯৫ কোটি টাকা বেড়ে ৬৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা একমাস তিনদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ১৬ মার্চ ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৬৯৮ কোটি টাকা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন বিমায় ঝুঁকছেন। ফলে গত এক মাসে বিমা কোম্পানির শেয়ারে দ্বিগুণ মুনাফা হয়েছে। তাতে এ খাতের শেয়ার লেনদেন, বাজার মূলধন ও রিটার্ন বেড়েছে।

তাদের মতে, দ্বিতীয় ধাপে করোনার তান্ডব, লকডাউন এবং ফ্লোর প্রাইস সংক্রান্ত বিএসইসির নির্দেশনার প্রভাবে চলতি মাসের শুরু থেকেই পুজিবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। আলোচ্য সময়ে তালিকাভুক্ত সব খাতের শেয়ার দর কমলেও শুধুমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বীমা খাত।

তারা মনে করছেন, আবারো দুর্বল কোম্পানিগুলো ঘিরে কারসাজি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যেখানে ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ার তলানিতে পড়ে রয়েছে সেখানে বীমা খাতের দুর্বল কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে কারসাজি চক্র মেতে উঠছে। দুর্বল বীমা খাতের শেয়ার নিয়ে মেতে উঠেছে এক শ্রেণীর অতি মুনাফালোভী বিনিয়োগকারীরা। এসব কারসাজি চক্র থেকে দূরে থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে সচেতন হওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার কারণে গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসা কমেছে। বছর শেষে এসব কোম্পানির মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এ বছরও করোনা চলছে, ফলে কোম্পানির মুনাফা হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তবে কারসাজি চক্রের দখলে রয়েছে বিমা কোম্পানির শেয়ার। ফলে এসব শেয়ারে মুনাফা হবেই বলে ধরে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে বিমায় বিনিয়োগের আগে দেখতে হবে কারসাজি চক্রের বিনিয়োগ রয়েছে কি না। নতুন করে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোববার আর্থিক ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের শেয়ারের দাম বাড়াকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাজারে উত্থান হয়। আর সোমবার এই দুই খাতে মূল্য সংশোধন হয়েছে। তবে এদিন বিমা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শেয়ারের দাম বাড়াকে কেন্দ্র করে ইতিবাচক ধারায় পুঁজিবাজারে লেনদেন শেষ হয়েছে।

সোমবার বিমা খাতে তালিকাভুক্ত ৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ৪৪টির, কমেছে ২টির, আর অপরিবর্তিত রয়েছে ২টির। এছাড়া লেনদেন হয়নি দুটি প্রতিষ্ঠানের। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তালিকাভুক্ত ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ১২টির, কমেছে ৫টির, আর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫টি শেয়ারের।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে লেনদেনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর বাড়বে আবার কমবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোন রকম কারণ ছাড়াই কোন কোম্পানির শেয়ার দর হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াটার মানে অন্য কিছু বুঝায়। নিশ্চয় এ কোম্পানিটিতে কারসাজি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে এখনি সাবধান থাকতে হবে। নয়তো নতুন করে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

এ বিষয়ে ডিএসইর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে শর্তে বলেন, বীমা খাতের কোম্পানিগুলো নিয়ে কারসাজি চলছে। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত বীমা খাতের এসব কোম্পানির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিমা কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি হচ্ছে। এ কারণে সরকার ঘোষিত লকডাউনে পুঁজিবাজার বন্ধ থাকার গুজব কিংবা সব কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে দরপতনের সময়ও বিমা কোম্পানির দাম বেড়েছে। হয়তো এ সময়ে কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা করেছে, তবে এসব শেয়ার বিনিয়োগে ঝুঁকির মাত্রাও বাড়ছে।
অবশ্য এর আগেও বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সামনে বিমা কোম্পানিগুলো ভালো করবে। কারণ সম্পদের তুলনায় অর্থনীতিতে বিমা খাতের অবদান কম। ফলে এখনো ভালো করার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিমা খাতের শেয়ারের দামের আবার এ উত্থানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও আতঙ্ক ভর করেছে।
একাধিক বিনিয়োগকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এর আগেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে হুহু করে বিমা খাতের শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়েছিল। পরে তা কমে যায়। ওই সময় কারসাজিকারকদের কেউ কেউ হয়তো তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি। তাই দ্বিতীয়বারের মতো দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করে হাতে থাকা বাকি শেয়ার বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। এ ছাড়া বিমা কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

প্রসঙ্গত, বিমার শেয়ার নিয়ে এর আগে কারসাজি হয়েছিল গত বছরের আগস্ট-নভেম্বরে। তখন এ খাতের কোনো কোনো শেয়ারের দাম ৪-৫ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। পরে ওই দাম কমতে শুরু করে। তাতেই বেশি দামে শেয়ার কিনে সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। গত বছর একটি সংঘবদ্ধ চক্র কারসাজির মাধ্যমে বিমার শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটায়। নানা তদন্তে সেসব কারসাজি চক্রের নামও বেরিয়ে আসে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন এসে আবারও পুরোনো কারসাজি চক্র বিমা শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে মেতেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা/জেএইচ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here