০৩:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬
রহস্যজনকভাবে ১৯ দিনে শেয়ার দর বেড়েছে ৩১ শতাংশ

অনিয়মে জর্জরিত লাভেলো আইসক্রীমে বিনিয়োগ ফেরত পেতে সময় লাগবে পাঁচ দশক! (পর্ব-১)

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৩:১৬:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬
  • / ১০১৭৯ বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বরাবরের মতোই প্রবল। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রবাসী পর্যন্ত সবাই স্বপ্ন দেখেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন। কিন্তু এ স্বপ্ন বারবার ভেঙে যাচ্ছে। কারণ অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানি সময়মতো প্রান্তিক প্রতিবেদন দাখিল করে না, আয়কে লুকিয়ে রাখে বা কম/বেশি দেখায়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলে। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর আটকে যান, বাজারে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়।

এর মধ্যে অন্যতম হলো তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসি, যাদের আর্থিক সূচক, শেয়ারদরের অস্বাভাবিক ওঠানামা, নানান রকম আর্থিক অনিয়মসহ শেয়ার কারসাজিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বাজারকে নাড়া দিয়েছে।

ঠিক এ কারণেই প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে কাগুজে মুনাফার প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তারল্য সঙ্কট, অনিয়ন্ত্রিত পাওনা ও এর আদায়ে ধীরগতি, ডিভিডেন্ডের অযৌক্তিকতা ও আর্থিক অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এরই ধারাবাহিকতায় লাভেলো আইসক্রীম নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা পাঁচ পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, অডিটেড আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এপ্রিল ২০২৬ শেষে লাভেলো আইসক্রিমের পিই রেশিও (Price to Earnings Ratio) অনুপাত ৫৩.৯৫। অর্থ্যাৎ কোম্পানির আয়ের বিপরীতে বিনিয়োগ ফেরত পেতে প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় লাগবে। সাধারণ ভাষায় বললে, আপনি যদি এখন ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তবে সেই আয়ের ভিত্তিতে টাকা ফেরত আসবে প্রায় প্রায় ৫৪ বছরে। বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের ভাষায় এটি একেবারেই ‘অযৌক্তিক ও হাস্যকর’ অবস্থা। বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, আমরা এক জীবনে তো বিনিয়োগ ফেরত পাবো না, তাহলে কেন এ শেয়ার কিনেছি? তাদের প্রশ্ন তবে কি আমরা প্রতারিত? তারা বলছেন, আমরা তো ভেবেছিলাম কোম্পানি ভালো করবে, এখন জানছি যে এই বিনিয়োগ ফেরত পেতে আমাদের নাতি–পুতিরা অপেক্ষা করবে!

এদিকে ডিএসই’র তথ্য বিশ্লেষনে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারদরের ওঠানামাও সন্দেহজনক। গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে শেয়ারের দাম ছিল ৬৪.৭০ টাকা। মাত্র ১৯ কার‌্যদিবসে মধ্যে অর্থ্যাৎ ৩০ এপ্রিলে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪.৭০ টাকা- যা প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আর আগে গত সেপ্টেম্বরে তা ১০৫ টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছিলো। এ সময়ে শেয়ার দর কিছুটা কমলেও ৫ এপ্রিলের এর তুলনায় ১৯ দিনে শেয়ার দর বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এতো কম সময়ে এত বড় দামের পরিবর্তনকে বাজার বিশেষজ্ঞরা অস্বাভাবিক বলছেন।

তাদের মতে, এর পেছনে কারসাজি চক্রের ইন্ধন রয়েছে। তারা কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়ায়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে, এরপর দাম কমার আগেই লাভ তুলে নেয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তখন উচ্চ দামে শেয়ার কিনে আটকে যান।

শুধু তাই নয়, ২০২৪-২৫ পুরো অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই কোম্পানির মুনাফা ছাড়িয়ে গেছে। আর বিষয়টি অস্বাভাবিক হওয়ায় গুজব ও জল্পনা বাড়ছে, যা কারসাজি চক্রকে সুবিধা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাভেলো আইসক্রিমের আর্থিক হিসাবে জাল-জালিয়াতির ভয়ানক চিত্র। সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে উঠে এসেছে, কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করেছে এবং আর্থিক বিবরণীতে দায় কম দেখিয়ে মুনাফা ও সম্পদের অবস্থান বেশি দেখানোর চেষ্টা করেছে। বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়, বরং পুঁজিবাজারে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাভেলো আইসক্রিম ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করলেও তা আর্থিক প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করেনি। ২০২০ সালে ৯ দশমিক ২৫ কোটি টাকা, ২০২১ সালে ৩২ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ৫২ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৭৩ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ০৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য আংশিক বা পুরোপুরি গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, এই ঋণের বিপরীতে দায় কম দেখানো হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক অবস্থানও কম দেখানো হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের সামনে একটি শক্তিশালী আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এই অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরে একই পদ্ধতিতে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে  বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে বাজারে প্রচারিত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে।

তদন্তকারীরা বলেছেন, ২০২০ ও ২০২১ সালে লাভেলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেন ইসলাম কাজী শফিক ও কোম্পানি পার্টনার কাজী শফিকুল ইসলাম। বাকি তিন বছর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে কাজী জহির অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার নজরুল হোসেন খান।

এই প্রেক্ষাপটে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) লাভেলো আইসক্রিম ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির অভিযোগে প্রথম ফৌজদারি মামলা, যা পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে, ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে লাভেলো আইসক্রিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক এবং তাদের মেয়ে পরিচালক মুহসিনিনা তৌফিকা ইকরাম ও মুহসিনিনা সারিকা ইকরামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। মুলত, গত নভেম্বরে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।

জানা গেছে, ইকরামুল হক, শামীমা নার্গিস হক, সারিকা ইকরাম ও তৌফিক ইকরামের বিরুদ্ধে সীমান্ত ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে দুদক জেনেছে, তারা যেকোনো সময় বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমন ঠেকানো দরকার।

এর আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারসাজির প্রমাণ পাওয়ার পর বিএসইসি তিনটি বিও অ্যাকাউন্টে বিক্রি স্থগিত করেছে। এগুলোর একটি হলো তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং- যা লাভেলোর সিস্টার কনসার্ন। বাকি দু’টি হলো সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজম্যান্ট এবং এর চেয়ারম্যান জুয়াং লিফেংয়ের অ্যাকাউন্ট। অর্থ্যাৎ কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট পক্ষও কারসাজিতে জড়িত ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। এখন থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তারা লাভেলো ও তৌফিকা ফুডসের শেয়ার বিক্রি করতে পারবে না, যদিও কেনা চালিয়ে যেতে পারবে।

বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। সেদিনই লাভেলোর শেয়ারদর ৩.১৫ শতাংশ কমে যায়। এতে প্রমাণ হয়, আগের দাম বৃদ্ধির পেছনে আয়ের উন্নতি নয়, বরং কৃত্রিম কারসাজি কাজ করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টেই যদি কারসাজির প্রমাণ মেলে, তবে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে খারাপ বার্তা।

কোম্পানিটির সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন দিশেহারা। অনেকেই ১০০ টাকার ওপরে শেয়ার কিনে আজ বিক্রি করতে পারছেন না। বিক্রি করলে ক্ষতি, আর রেখে দিলেও আয়ের তুলনায় এতো উচ্চ দাম ফেরত পেতে ৫৪ বছর অপেক্ষা করতে হবে। অনেকেই ঋণ নিয়ে কিংবা কষ্টার্জিত সর্বশেষ পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন, এখন সেই ঋণের সুদ আর পুঁজি হারানোর যন্ত্রণা তাদের কাঁধে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজারকে অনির্ভরযোগ্য মনে করছেন। নতুন বিনিয়োগকারীরাও ভয় পাচ্ছেন বাজারে আসতে। এতে বাজারের তারল্য কমছে, দাম অস্থির হচ্ছে। ফলাফল-পুঁজিবাজার তার মূল লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যখন একের পর এক কোম্পানি প্রান্তিক প্রতিবেদন দেয় না বা তাদের কারসাজির প্রমাণ মেলে, তখন বাজারকে কোনোভাবেই বিনিয়োগবান্ধব বলা যায় না। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিএসইসি ইতিমধ্যে তিনটি অ্যাকাউন্টে বিক্রি স্থগিত করে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এটি যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, এখনই কোম্পানিকে প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশে বাধ্য করতে হবে, জরিমানা আরোপ করতে হবে, পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেনে রিয়েল-টাইম নজরদারি জোরদার করতে হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। কিন্তু কোম্পানিগুলো কাগুজে হিসাবের খেলায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। ইপিএস ও এনএভি আর ডিভিডেন্ড দিয়ে শেয়ারের দাম বাড়ালেও বাস্তবতা হলো নগদ প্রবাহ সংকট। বিনিয়োগকারীরা একবার প্রতারিত হলে তারা পুরো বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।’

বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, আমরা রিপোর্ট দেখে বিনিয়োগ করি। ইপিএস বাড়ছে, এনএভি বাড়ছে আর ডিভিডেন্ডও দিচ্ছে- এসব দেখে আমরা মনে করেছি কোম্পানি ভালো অবস্থায় আছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা প্রতারিত হয়েছি। তারা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ কষ্টের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করি ভালো কিছু পাবো বলে। কিন্তু যখন দেখি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নেই, তখন মনে হয় এই বাজার কেবল বড় খেলোয়াড়দের জন্য, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি একদিকে ইপিএস বাড়িয়ে কাগজে লাভ দেখাচ্ছে, অন্যদিকে ডিভিডেন্ড দিয়ে আমাদের প্রলুব্ধ করছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সেটা হলো কাগুজে স্বপ্ন, বাস্তবে কিছুই নেই।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেদিন শুনলাম শেয়ার কারসাজিতে খোদ কোম্পানি কর্তৃপক্ষই জড়িত, আর এ কারণে বিএসইসি তিনটা অ্যাকাউন্টে বিক্রি বন্ধ করেছে, বুঝলাম বিনিয়োগকারীরা সত্যিই ফাঁদে পড়েছে। কারসাজিতে কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট লোক জড়িত থাকলে আমাদের অবস্থা কী হবে?, তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম বাজারে আসা কোম্পানিগুলো আইন মেনে চলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখছি আইন ভাঙছে তারাই, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেরি করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এতে তো বিনিয়োগকারীর আস্থা একেবারেই ভেঙে যাচ্ছে।’

জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিএসইসি ইতিমধ্যেই কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নিয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ না দেয় কিংবা কোথাও অসংগতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক তদন্ত করা হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।’ (চলবে…)

বিজনেস জার্নাল/এইচকে

শেয়ার করুন

রহস্যজনকভাবে ১৯ দিনে শেয়ার দর বেড়েছে ৩১ শতাংশ

অনিয়মে জর্জরিত লাভেলো আইসক্রীমে বিনিয়োগ ফেরত পেতে সময় লাগবে পাঁচ দশক! (পর্ব-১)

আপডেট: ০৩:১৬:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বরাবরের মতোই প্রবল। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রবাসী পর্যন্ত সবাই স্বপ্ন দেখেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন। কিন্তু এ স্বপ্ন বারবার ভেঙে যাচ্ছে। কারণ অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানি সময়মতো প্রান্তিক প্রতিবেদন দাখিল করে না, আয়কে লুকিয়ে রাখে বা কম/বেশি দেখায়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলে। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর আটকে যান, বাজারে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়।

এর মধ্যে অন্যতম হলো তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসি, যাদের আর্থিক সূচক, শেয়ারদরের অস্বাভাবিক ওঠানামা, নানান রকম আর্থিক অনিয়মসহ শেয়ার কারসাজিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বাজারকে নাড়া দিয়েছে।

ঠিক এ কারণেই প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে কাগুজে মুনাফার প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তারল্য সঙ্কট, অনিয়ন্ত্রিত পাওনা ও এর আদায়ে ধীরগতি, ডিভিডেন্ডের অযৌক্তিকতা ও আর্থিক অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এরই ধারাবাহিকতায় লাভেলো আইসক্রীম নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা পাঁচ পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, অডিটেড আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এপ্রিল ২০২৬ শেষে লাভেলো আইসক্রিমের পিই রেশিও (Price to Earnings Ratio) অনুপাত ৫৩.৯৫। অর্থ্যাৎ কোম্পানির আয়ের বিপরীতে বিনিয়োগ ফেরত পেতে প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় লাগবে। সাধারণ ভাষায় বললে, আপনি যদি এখন ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তবে সেই আয়ের ভিত্তিতে টাকা ফেরত আসবে প্রায় প্রায় ৫৪ বছরে। বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের ভাষায় এটি একেবারেই ‘অযৌক্তিক ও হাস্যকর’ অবস্থা। বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, আমরা এক জীবনে তো বিনিয়োগ ফেরত পাবো না, তাহলে কেন এ শেয়ার কিনেছি? তাদের প্রশ্ন তবে কি আমরা প্রতারিত? তারা বলছেন, আমরা তো ভেবেছিলাম কোম্পানি ভালো করবে, এখন জানছি যে এই বিনিয়োগ ফেরত পেতে আমাদের নাতি–পুতিরা অপেক্ষা করবে!

এদিকে ডিএসই’র তথ্য বিশ্লেষনে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারদরের ওঠানামাও সন্দেহজনক। গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে শেয়ারের দাম ছিল ৬৪.৭০ টাকা। মাত্র ১৯ কার‌্যদিবসে মধ্যে অর্থ্যাৎ ৩০ এপ্রিলে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪.৭০ টাকা- যা প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আর আগে গত সেপ্টেম্বরে তা ১০৫ টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছিলো। এ সময়ে শেয়ার দর কিছুটা কমলেও ৫ এপ্রিলের এর তুলনায় ১৯ দিনে শেয়ার দর বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এতো কম সময়ে এত বড় দামের পরিবর্তনকে বাজার বিশেষজ্ঞরা অস্বাভাবিক বলছেন।

তাদের মতে, এর পেছনে কারসাজি চক্রের ইন্ধন রয়েছে। তারা কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়ায়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে, এরপর দাম কমার আগেই লাভ তুলে নেয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তখন উচ্চ দামে শেয়ার কিনে আটকে যান।

শুধু তাই নয়, ২০২৪-২৫ পুরো অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই কোম্পানির মুনাফা ছাড়িয়ে গেছে। আর বিষয়টি অস্বাভাবিক হওয়ায় গুজব ও জল্পনা বাড়ছে, যা কারসাজি চক্রকে সুবিধা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাভেলো আইসক্রিমের আর্থিক হিসাবে জাল-জালিয়াতির ভয়ানক চিত্র। সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে উঠে এসেছে, কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করেছে এবং আর্থিক বিবরণীতে দায় কম দেখিয়ে মুনাফা ও সম্পদের অবস্থান বেশি দেখানোর চেষ্টা করেছে। বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়, বরং পুঁজিবাজারে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাভেলো আইসক্রিম ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করলেও তা আর্থিক প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করেনি। ২০২০ সালে ৯ দশমিক ২৫ কোটি টাকা, ২০২১ সালে ৩২ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ৫২ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৭৩ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ০৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য আংশিক বা পুরোপুরি গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, এই ঋণের বিপরীতে দায় কম দেখানো হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক অবস্থানও কম দেখানো হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের সামনে একটি শক্তিশালী আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এই অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরে একই পদ্ধতিতে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে  বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে বাজারে প্রচারিত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে।

তদন্তকারীরা বলেছেন, ২০২০ ও ২০২১ সালে লাভেলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেন ইসলাম কাজী শফিক ও কোম্পানি পার্টনার কাজী শফিকুল ইসলাম। বাকি তিন বছর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে কাজী জহির অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার নজরুল হোসেন খান।

এই প্রেক্ষাপটে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) লাভেলো আইসক্রিম ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির অভিযোগে প্রথম ফৌজদারি মামলা, যা পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে, ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে লাভেলো আইসক্রিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক এবং তাদের মেয়ে পরিচালক মুহসিনিনা তৌফিকা ইকরাম ও মুহসিনিনা সারিকা ইকরামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। মুলত, গত নভেম্বরে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।

জানা গেছে, ইকরামুল হক, শামীমা নার্গিস হক, সারিকা ইকরাম ও তৌফিক ইকরামের বিরুদ্ধে সীমান্ত ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে দুদক জেনেছে, তারা যেকোনো সময় বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমন ঠেকানো দরকার।

এর আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারসাজির প্রমাণ পাওয়ার পর বিএসইসি তিনটি বিও অ্যাকাউন্টে বিক্রি স্থগিত করেছে। এগুলোর একটি হলো তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং- যা লাভেলোর সিস্টার কনসার্ন। বাকি দু’টি হলো সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজম্যান্ট এবং এর চেয়ারম্যান জুয়াং লিফেংয়ের অ্যাকাউন্ট। অর্থ্যাৎ কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট পক্ষও কারসাজিতে জড়িত ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। এখন থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তারা লাভেলো ও তৌফিকা ফুডসের শেয়ার বিক্রি করতে পারবে না, যদিও কেনা চালিয়ে যেতে পারবে।

বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। সেদিনই লাভেলোর শেয়ারদর ৩.১৫ শতাংশ কমে যায়। এতে প্রমাণ হয়, আগের দাম বৃদ্ধির পেছনে আয়ের উন্নতি নয়, বরং কৃত্রিম কারসাজি কাজ করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টেই যদি কারসাজির প্রমাণ মেলে, তবে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে খারাপ বার্তা।

কোম্পানিটির সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন দিশেহারা। অনেকেই ১০০ টাকার ওপরে শেয়ার কিনে আজ বিক্রি করতে পারছেন না। বিক্রি করলে ক্ষতি, আর রেখে দিলেও আয়ের তুলনায় এতো উচ্চ দাম ফেরত পেতে ৫৪ বছর অপেক্ষা করতে হবে। অনেকেই ঋণ নিয়ে কিংবা কষ্টার্জিত সর্বশেষ পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন, এখন সেই ঋণের সুদ আর পুঁজি হারানোর যন্ত্রণা তাদের কাঁধে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজারকে অনির্ভরযোগ্য মনে করছেন। নতুন বিনিয়োগকারীরাও ভয় পাচ্ছেন বাজারে আসতে। এতে বাজারের তারল্য কমছে, দাম অস্থির হচ্ছে। ফলাফল-পুঁজিবাজার তার মূল লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যখন একের পর এক কোম্পানি প্রান্তিক প্রতিবেদন দেয় না বা তাদের কারসাজির প্রমাণ মেলে, তখন বাজারকে কোনোভাবেই বিনিয়োগবান্ধব বলা যায় না। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিএসইসি ইতিমধ্যে তিনটি অ্যাকাউন্টে বিক্রি স্থগিত করে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এটি যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, এখনই কোম্পানিকে প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশে বাধ্য করতে হবে, জরিমানা আরোপ করতে হবে, পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেনে রিয়েল-টাইম নজরদারি জোরদার করতে হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। কিন্তু কোম্পানিগুলো কাগুজে হিসাবের খেলায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। ইপিএস ও এনএভি আর ডিভিডেন্ড দিয়ে শেয়ারের দাম বাড়ালেও বাস্তবতা হলো নগদ প্রবাহ সংকট। বিনিয়োগকারীরা একবার প্রতারিত হলে তারা পুরো বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।’

বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, আমরা রিপোর্ট দেখে বিনিয়োগ করি। ইপিএস বাড়ছে, এনএভি বাড়ছে আর ডিভিডেন্ডও দিচ্ছে- এসব দেখে আমরা মনে করেছি কোম্পানি ভালো অবস্থায় আছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা প্রতারিত হয়েছি। তারা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ কষ্টের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করি ভালো কিছু পাবো বলে। কিন্তু যখন দেখি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নেই, তখন মনে হয় এই বাজার কেবল বড় খেলোয়াড়দের জন্য, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি একদিকে ইপিএস বাড়িয়ে কাগজে লাভ দেখাচ্ছে, অন্যদিকে ডিভিডেন্ড দিয়ে আমাদের প্রলুব্ধ করছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সেটা হলো কাগুজে স্বপ্ন, বাস্তবে কিছুই নেই।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেদিন শুনলাম শেয়ার কারসাজিতে খোদ কোম্পানি কর্তৃপক্ষই জড়িত, আর এ কারণে বিএসইসি তিনটা অ্যাকাউন্টে বিক্রি বন্ধ করেছে, বুঝলাম বিনিয়োগকারীরা সত্যিই ফাঁদে পড়েছে। কারসাজিতে কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট লোক জড়িত থাকলে আমাদের অবস্থা কী হবে?, তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম বাজারে আসা কোম্পানিগুলো আইন মেনে চলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখছি আইন ভাঙছে তারাই, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেরি করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এতে তো বিনিয়োগকারীর আস্থা একেবারেই ভেঙে যাচ্ছে।’

জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিএসইসি ইতিমধ্যেই কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নিয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ না দেয় কিংবা কোথাও অসংগতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক তদন্ত করা হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।’ (চলবে…)

বিজনেস জার্নাল/এইচকে