নতুন চেয়ারম্যান পাচ্ছে বিএসইসি-আইডিআরএ
- আপডেট: ০৪:২১:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬
- / ১০২২২ বার দেখা হয়েছে
পুঁজিবাজারের দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চলতি সপ্তাহেই পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আর ইতোমধ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইইডিআরএ) চেয়ারম্যান পদ থেকে এম আসলাম আলম পদত্যাগ করায় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। দুই শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য এরইমধ্যে আইনে সংশোধন এনেছে সরকার। চলতি সপ্তাহেই আইনের সংশোধনীর গেজেট প্রকাশ করার পাশাপাশি বিএসইসি- আইডিআরএ নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। শীর্ষ দুই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা তুলে দিতে দুটি সংশোধনী বিল পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান হতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক ডজন ব্যক্তির নাম জমা পড়েছে। তবে দৌঁড়ে এগিয়ে রয়েছেন তিন জন। এর মধ্যে একজন সরকারের সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। তাঁর রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। আরেকজন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। যারও অতীতে বিএসইসিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এছাড়া অপরজন হলেন মাসুদ খান। যিনি একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করেছেন। যদিও মাসুদ খানের নিয়োগ হলে তা হবে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা! কারণ মাসুদ খান ও তার পরিবারের সদস্যরা পুঁজিবাজারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ হবে পুঁজিবাজারের স্বার্থবিরোধী। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান রাশেদ মাকসুদ কমিশনের কালো থাবা থেকে দেশের পুঁজিবাজারকে রক্ষা করতে হলে কমিশনকে ঢেলে সাজাতে হবে।
সূত্র মতে, মাসুদ খান এইজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। প্রতিষ্ঠানটির মোট ৫০ লাখ শেয়ারের মধ্যে মাসুদ খান এক লাখ, আসাদ খান দুই লাখ ৫০ হাজার, আসিফ খান ১০ লাখ, ওয়াসিম খান সাত লাখ ৫০ হাজার ও সামির খান নয় লাখ অর্থাৎ এইজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ৫০ লাখ শেয়ারের মধ্যে মাসুদ খান ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানায় রয়েছে ৩০ লাখ (ত্রিশ লাখ) শেয়ার। অবশ্য শুধু এইজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিই নয়; এইজ রিচার্জ এন্ড কনসাল্টিং লিমিটেড নামীয় প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিক মাসুদ খান ও তার পরিবার। এভাবে কমিশনের নিয়ন্ত্রনাধীন একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মালিককে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের শীর্ষ পদে বসালে তা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে বলে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিএসইসি থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে চলতি সপ্তাহেই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে নতুন চেয়ারম্যান কে হচ্ছেন, তা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ওপর নির্ভর করছে। সরকার একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে চায়। সে লক্ষ্যেই কার্যক্রম চলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রীমহল তাদের নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মাসুদ খানকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বসানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। শুধু তাই নয়, এই স্বার্থান্বেষী কুচক্রীমহলের একটি অংশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ কমিশনও নানা হঠকারী সিদ্বান্ত গ্রহণ করেছে। মিউচুয়্যাল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো কালো আইন বাস্তবায়নসহ নানাভাবে এই স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল প্রতক্ষ্যভাবে রাশেদ মাকসুদ কমিশনকে প্রভাবিত করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান একজন বয়স্ক ব্যক্তি হবেন, এটা নিশ্চিত। তিনি কে, তা চলতি সপ্তাহেই জানা যাবে। সরকার অনেক চিন্তাভাবনা করেই তাকে নিয়োগ দিচ্ছেন। সরকার চায় পুঁজিবাজারে গতি আসুক এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়–ক। পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করে সরকার যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এখনও বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ পদত্যাগ করেননি। তিনি কি পদত্যাগ করবেন, নাকি তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে- এমন প্রশ্ন করা হলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এটা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাপার। তার সঙ্গে সরকারের ওপর মহলের কী আলোচনা হয়েছে, সেটা তিনিই জানেন। তবে যতটুকু বুঝি তিনি বিব্রতকর অবস্থায় পড়বেন এবং সরকার সমালোচনার মুখে পড়বে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার না। এটা খুব অল্প সময়ের ব্যাপার। এর আগে আইডিআরএ চেয়ারম্যান পদ থেকে এম আসলাম আলম পদত্যাগ করেছিলেন। বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে, বর্তমান চেয়ারম্যান হয়তো পদত্যাগ করবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে এক ডজনের বেশি নামের তালিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসেছে। তবে কে বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান হবেন, সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। চলতি সপ্তাহেই এটি চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার চাচ্ছে দ্রুত বিএসইসিতে পরিবর্তন আনতে।
সংশোধন আনা হয়েছে দুই আইনে
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে দ্রুত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন এবং বিমা আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ বয়সের সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে যে কোনো বয়সী ব্যক্তিকে এখন বিএসইসি ও আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে।
এতদিন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী বিএসইসি’র চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা ছিল ৬৫ বছর। অর্থাৎ, ৬৫ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়ার বা পদে থাকার যোগ্যতা হারাতেন। অন্যদিকে, আইডিআরএর চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা ছিল ৬৭ বছর।
গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সের সীমা তুলে দিয়ে আইনের সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত ভেটিং সম্পন্ন করে গত বৃহস্পতিবার সংসদের আইনের সংশোধনী বিল আকারে পাস হয়। এখন এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
সূত্র জানিয়েছে, এই সংশোধনী আনতে বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা গেছে, অনেক দেশেই পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা নেই। তবে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা আছে। এক্ষেত্রে ভারতে সর্বোচ্চ ৬২ বছর, পাকিস্তানে ৬৫ বছর এবং থাইল্যান্ডে ৭০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে গতি বাড়াতে চেয়ারম্যান পরিবর্তন জরুরি নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক সদস্য বলেন, শেয়ারবাজারে গতি বাড়াতে দ্রুত বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা উচিত। বর্তমান চেয়ারম্যানের ওপর থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বিএসইসির চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সী তুলে দিতে আইন যে দ্রুত সংশোধন করা হয়েছে, তাতে আমরা আশা করছি খুব দ্রুতই বর্তমান চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে একজন সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিকেই সরকার বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান করবেন। যিনি সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সেই সঙ্গে বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব দ্রুত বাজারে কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও আনবেন এবং দুর্বল কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেবেন না, সেটিও প্রত্যাশা আমাদের। দ্রুত কয়েকটি ভালো কোম্পানি আনতে পারলে বাজারে গতি ফিরে আসবে।
প্রত্যাশা পুঁজিবাজারের আস্থা ফেরানো
বিএসইসি’র চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। নতুন চেয়ারম্যানের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যাশাটা খুব সাধারণ। সেটা হচ্ছে প্রথমে পুঁজিবাজারে আস্থাটা ফিরিয়ে আনতে হবে, যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হবেন না। পুঁজিবাজারের যে পুঁজিটা বিনিয়োগ করা হবে, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা নিরাপদ থাকবে।
তিনি বলেন, লাভ নাও হতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগটা নিরাপদ থাকতে হবে। ধরেন একটা ধোকা আইপিও এলো, সেটাতে তো আপনার বিনিয়োগটাই চলে যাবে, লাভ তো দূরের কথা। এই স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা পুঁজিবাজারে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। এটা করতে না পারলে কখনোই ঘুরে দাঁড়াবে না।
এদিকে আইইডিআরএ’র চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম পদত্যাগ করায় দীর্ঘদিন থেকে শূন্য আছে পদটি। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। আইইডিআরএ’র চেয়ারম্যান হিসেবেও আলোচনায় আছেন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ।
ঢাকা/এসএইচ

































