ঋণখেলাপিদের জন্য আরও বড় ছাড়
- আপডেট: ১২:৫০:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই ২০২২
- / ১০৩৩২ বার দেখা হয়েছে
বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতিমালা আরও শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডাউনপেমেন্টের হারও অনেক কমানো হয়েছে। নতুন নীতিমালায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের মেয়াদি ঋণখেলাপি হলে চার দফায় ২৯ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা যাবে। খেলাপি হওয়ার আগে নিয়মিত থাকা অবস্থায় ঋণ পুনর্গঠন করা যাবে। আগে কোনো ঋণ তিন দফায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ ছিল।
সোমবার (১৮ জুলাই) ঋণখেলাপিদের এমন অনেক বড় ছাড় দিয়ে এ নীতিমালা সার্কুলার আকারে জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাবেক অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এমন বড় ছাড় পেলেন ঋণখেলাপিরা।
অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুক–টুইটার–লিংকডইন–ইন্সটাগ্রাম–ইউটিউব
নীতিমালায় বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের স্বার্থে কোনো ঋণ চারবার পর্যন্ত পুনঃতফসিল করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ৫০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের মেয়াদি ঋণে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় গ্রেস পিরিয়ডসহ আট বছর করে পুনঃতফসিল করতে পারবে ব্যাংক। ১০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণ প্রথম ও দ্বিতীয়বার সাত বছর এবং ১০০ কোটি টাকার কম ঋণ প্রথম ও দ্বিতীয় দফা ছয় বছর করে পুনঃতফসিল করা যাবে। প্রতি পর্যায়ে তৃতীয় দফায় এক বছর করে কম সময়ের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকবে। চতুর্থ দফায় আরও এক বছর করে কম মেয়াদে পুনঃতফসিল করা যাবে। এতে করে সব মিলিয়ে চার দফায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের মেয়াদি ঋণ ২৯ বছর, ১০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণ ২৫ বছর এবং ১০০ কোটি টাকার কম ঋণ ২১ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা যাবে। খেলাপি হওয়ার আগে নিয়মিত ঋণ পুনর্গঠনও করতে পারবে ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই অবশিষ্ট মেয়াদের ৫০ শতাংশ সময় বাড়ানো যাবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১২ বছর মেয়াদি কোনো ঋণ দুই বছর পরিশোধের পর হয়তো কেউ পুনর্গঠন করতে চান। এ অবস্থায় তিনি বাকি ১০ বছরের সঙ্গে আরও পাঁচ বছর মেয়াদ পাবেন।
আগের নিয়মে একটি ঋণ খেলাপি হওয়ার প্রথম পর্যায় তথা সাব-স্ট্যান্ডার্ড অবস্থায় প্রথম দফা ৩৬ মাস, দ্বিতীয় দফা ২৪ মাস এবং তৃতীয় দফা ১২ মাসের জন্য পুনঃতপশিল করা যেত। ডাউটফুল বা সন্দেহজনক মানের খেলাপি ঋণ প্রথম পর্যায়ে ২৪ মাস, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮ মাস ও তৃতীয় পর্যায়ে ১২ মাসের জন্য পুনঃতফসিল করা যেত। আর খেলাপির শেষ পর্যায় তথা মন্দ মানের খেলাপি ২৪ মাস, ১৮ মাস ও ১২ মাস মেয়াদে পুনঃতফসিলের সুযোগ ছিল।
নতুন নীতিমালার আলোকে ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের চলমান ও তলবি ঋণ প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে সাত বছর করে ১৪ বছর, তৃতীয় পর্যায়ে ছয় বছর এবং চতুর্থ পর্যায়ে পাঁচ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করতে পারবে। ৫০ কোটি টাকা থেকে ৩০০ কোটি টাকার কম হলে প্রতি পর্যায়ে পুনঃতফসিলের সময়সীমা এক বছর করে কমবে। আর ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত আরও এক বছর করে কমবে। এ ধরনের অঙ্কের ঋণে প্রথম ও দ্বিতীয়বার পাঁচ বছর, তৃতীয়বার চার বছর এবং চতুর্থবার তিন বছরের জন্য নিয়মিত করা যাবে। তবে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ প্রথমবার সর্বোচ্চ তিন বছর এবং পরবর্তী তিনবার আড়াই বছর করে মেয়াদে পুনঃতপশিল করা যাবে। সব ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড হবে ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কেন এ রকম নির্দেশনা দিল, বোধগম্য নয়। একশ্রেণির খেলাপি এর পুরো সুযোগ নেবে। ফলে দীর্ঘদিন আর ব্যাংকের টাকা ফেরত আসবে না। তখন ব্যাংকের তারল্যে ভাটা পড়বে। নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। এমনকি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যাংক সমস্যায় পড়তে পারে।
ডাউনপেমেন্টের হার অনেক কমিয়ে নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ৫০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের মেয়াদি ঋণ নিয়মিত করতে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ৫ শতাংশ অথবা মোট বকেয়া ঋণের আড়াই শতাংশের মধ্যে যা কম, তা জমা দিতে হবে। ১০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণে মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ৬ শতাংশ বা মোট বকেয়া ঋণের সাড়ে ৩ শতাংশের মধ্যে যা কম, তা দিতে হবে। আর ১০০ কোটি টাকার কম ঋণে এ হার ৭ শতাংশ অথবা সাড়ে ৪ শতাংশ। চলমান ও তলবি ঋণে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণে আড়াই শতাংশ, ৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার কম ঋণে মোট বকেয়ার ৩ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার কম ঋণে ৪ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিতে হবে। তৃতীয় ও চতুর্থ দফা পুনঃতপশিলে প্রতি পর্যায়ে ১ শতাংশ বেশি আদায় করতে হবে। এত দিন প্রতি ক্ষেত্রে প্রথম দফা পুনঃতপশিলের জন্য বকেয়া অংশের ১৫ শতাংশ অথবা মোট ঋণস্থিতির ১০ শতাংশের মধ্যে যা কম, সে পরিমাণ জমা দিতে হতো। দ্বিতীয় পর্যায়ে বকেয়া অংশের ৩০ শতাংশ অথবা মোট ঋণস্থিতির ২০ শতাংশের মধ্যে যা কম, সে পরিমাণ জমা দিতে হতো। আর তৃতীয় পর্যায়ে ছিল মোট বকেয়ার ৫০ শতাংশ অথবা ঋণস্থিতির ৩০ শতাংশের মধ্যে যা কম।
নতুন নীতিমালার আলোকে পুনঃতফসিল করা গ্রাহক ওই ব্যাংক বা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফা পুনঃতফসিল করা ঋণের বিপরীতে পুরো সুদ আয় খাতে নিতে পারবে ব্যাংক। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় আয় প্রকৃত আদায় সাপেক্ষে আয়পাতে নেওয়া যাবে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, করোনার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব, বহির্বিশ্বে সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থা প্রলম্বিত হওয়ার কারণে উদ্ভূত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নতুনভাবে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও শ্রেণীকৃত ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা জারি করা হলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতিমালা করতে হবে। এক খাতের নামে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার কিংবা অভ্যাসগত খেলাপি হলে তার ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন বিবেচনা করা যাবে না।
ঢাকা/টিএ






































