নতুন আবাসে রোহিঙ্গারা
- আপডেট: ১০:৪৯:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০
- / ১০৩৯৪ বার দেখা হয়েছে
সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। বইছে মৃদু বাতাস। হালকা শীতে রোদের তাপটা বেশ মিষ্টিই লাগছিল। ঘড়িতে তখন দুপুর আড়াইটা। একে একে ভাসানচরে ভিড়ল সাতটি জাহাজ। এসব জাহাজ থেকে হাসিমুখে সতর্কতার সঙ্গে নামল এক হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গা। যাদের সানন্দে গ্রহণ করতে অনেক আগেই প্রস্তুত ছিল নোয়াখালীর হাতিয়ার নৈসর্গিক দ্বীপ ভাসানচর। জাহাজ থেকে নামার পরই ভাসানচরের জেটি এলাকায় একটি বড় সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। এতে লেখা ‘ভাসানচরে স্বাগতম’। শুধু ওই শুভেচ্ছাবার্তা নয়, সামনে পাকা সড়কের মোড়ে মোড়ে রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানিয়ে অনেক ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে নিজ বসতভিটা থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের মধ্যে একটি দলকে গতকাল শুক্রবার ভাসানচরে স্থানান্তর করা হলো। প্রথম দফায় ভাসানচরে স্বেচ্ছায় আসা এই দলে পুরুষ ৩৬৮, নারী ৪৬৪ জন এবং শিশু ৮১০টি।
গতকাল ভাসানচরে তাদের নতুন বসতভিটা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কক্সবাজারের ঘিঞ্জি ক্যাম্প থেকে ভাসানচরের খোলামেলা পরিবেশ ও পাকা ঘর এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেখে রোহিঙ্গারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। তাদের চোখে-মুখে ছিল আনন্দের ছাপ।
সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তারা জানান, সব মিলিয়ে এক লাখ রোহিঙ্গা স্থানান্তরের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত প্রায় ১৩ হাজার একর আয়তনের ভাসানচর। আধুনিক বর্জ্য ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বায়োগ্যাস প্লান্ট ও সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এখানে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
রোহিঙ্গাদের একটি অংশ অস্থায়ীভাবে ভাসানচরে স্থানান্তরের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ‘আশ্রয়ণ-৩’ নামে প্রকল্প নেওয়া হয়। চরটি বসবাসের উপযোগী করতে সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও বনায়ন করা হয়। দ্বীপটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরকে একটি ‘টাউনশিপ’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
চট্টগ্রামের বোট ক্লাব থেকে ভাসানচর পর্যন্ত অন্তত ৪০ রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা হয় সমকালের এই প্রতিবেদকের। তারা সবাই জানান, নতুন স্বপ্ন নিয়েই নতুন ঠিকানায় যাচ্ছেন তারা। কেউ তাদের আসতে জোর জবরদস্তি করেননি। তাদের আশা কক্সবাজারের তুলনায় ভাসানচরে অনেক সুখে-শান্তিতে থাকবেন।
এ যেন আনন্দযাত্রা :শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের নেভির বোট ক্লাব জেটি এলাকায় রোহিঙ্গাদের জাহাজে তোলা হয়। জাহাজে তোলার সময় অনেকের হাতে গৃহস্থালির টুকটাক জিনিসপত্র ছিল। জাহাজে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। জাহাজে তোলার আগে সকল রোহিঙ্গাকে মাস্কও সরবরাহ করা হয়। নৌবাহিনীর ৬টি ও সেনাবাহিনীর একটি জাহাজে করে সুশৃঙ্খলভাবে তোলার পর সাড়ে ১০টার দিকে জাহাজ ভাসানচরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। রোহিঙ্গাবাহী ওই সাত জাহাজ ছাড়াও নিরাপত্তায় আরও কিছু জাহাজ ও বোট সার্বক্ষণিক টহলে ছিল। জাহাজে যাবার সময় অনেক রোহিঙ্গা ভাসানচর ঘিরে তাদের স্বপ্নের কথা শোনান। তাদের মধ্যে একজন হলেন আবদুল হামিদ। তিনি তার মাতৃভাষায় সমকালকে অনেক কথা বলেন। যার অর্থ এরকম- ‘সুখের জন্য ভাসানচর যাচ্ছি। কুতুপালং ক্যাম্পের পরিবেশ তেমন ভালো না। মানুষে মানুষে সয়লাব। আমরা জিয়া মাঝির লোক। মাঝি বলেছে যে ভাসানচর গেলে ক্ষেতে চাষ করতে পারব। হাঁস, মুরগি পালতে পারব। তাই নতুন স্বপ্ন নিয়েই ভাসানচর যাচ্ছি।’
‘স্বেচ্ছায় এসেছি, কেউ জোর করেনি’:২৩ বছর বয়সের আয়েশা বেগম। জাহাজে তার কোলে ছোট্ট এক শিশু। পাশেই ছিল আরেক শিশু। আয়েশা বলেন, ‘দুই মেয়ে, ভাই ও মাকে নিয়ে ভাসানচর যাচ্ছি। ২২ বছর ধরে বাংলাদেশে আছি। কুতুপালংয়ে এত কষ্ট করে থাকা দায়। তাই স্বেচ্ছায় কক্সবাজার ছাড়ছি। ভাসানচরে সন্তানদের লেখাপড়া করার সুযোগ হবে। চাইলে ২-৩ মাস পর কক্সবাজারে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা যাবে।’ আয়েশার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নূর হোসেন নামে এক বাংলাদেশি নাগরিককে বিয়ে করেন তিনি। তার স্বামী পেশায় অটোরিকশা চালক। স্বামী বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় তাকে ভাসানচরে সঙ্গে আনতে পারেননি। তবে স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ থাকবে বলে জানান আয়েশা। তার বড় বোন ফাতেমা এখনও কক্সবাজারে রয়েছেন। তার বাবা কুতুপালং ক্যাম্পে শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান।
জাহাজে বসেই কথা হয় আরেক রোহিঙ্গা ৮০ বছরের লুৎফর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, ৪ বছর ধরে বাংলাদেশে আছেন। নাতিপুতিসহ পরিবারের মোট ২০ সদস্যকে নিয়ে ভাসানচরে যাচ্ছেন। পরিবারের প্রায় সব মালপত্র আগেই জাহাজে তুলে দিয়েছেন তারা। তবে প্রিয় পানের বাটা নিজের সঙ্গে রেখেছেন। কিছু সময় পরপরই পানের বাটা থেকে পান চিবুচ্ছিলেন প্রবীণ এই লুৎফর।
অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে সোজা ওয়্যারহাউস :জাহাজ থেকে ভাসানচরের জেটি এলাকায় নামার পরই রোহিঙ্গাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। এরপর জেটি এলাকার অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্পে কিছু সময় রাখা হয় তাদের। সেখান থেকে ছোট ও বড় গাড়িতে তাদের নেওয়া হয় ওয়্যারহাউসে। সেখানে রোহিঙ্গা শিশুদের বেলুন, খেলনা ও চকলেট দিয়ে বরণ করা হয়। ওয়্যারহাউসে রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন ভাসানচরের আশ্রয়ণ-৩-এর প্রকল্প পরিচালক কমডোর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এতদিন আপনারা ছিলেন গ্রামে। এখন শহরের মতো একটি আবাসিক এলাকায় এসেছেন। এখানে ডাক্তার আছে। চিকিৎসাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আছে। ওপরওয়ালার কাছে শুকরিয়া আপনারা ভালোভাবে এখানে আসতে পেরেছেন।’ তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা প্রকল্প শেষ করতে পেরেছি। এই প্রকল্পের পেছনে যারা ছিলেন সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এরপর মসজিদের ইমাম সবার কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করেন।
কক্সবাজারের চাপ কমাতেই স্থানান্তর :প্রথম দফায় রোহিঙ্গাদের একটি দলকে ভাসানচরে স্থানান্তর ও পরবর্তী করণীয় ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক কমডোর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী সমকালকে জানান, ‘ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের হোস্ট কমিউনিটি নেই। এখানে তাদের জন্য চাষাবাদের ব্যবস্থা রয়েছে। মাছ চাষ ও পশু পালনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। এটা এনজিও না-কি সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় করবে- এটা শিগগিরই জানা যাবে। এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য ভাসানচর সার্বিকভাবে প্রস্তুত। যারা এখানে এসেছে তারা আবার ফেরত যেতে পারবে কি-না- এটা দেখবেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার। অর্থাৎ রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনার বা ট্রিপল আরসি। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। কক্সবাজারে চাপ কমাতেই এই ভাসানচর প্রকল্প। একসময় দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হবে। এখানে অনেক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে একটি হলো বাচ্চাদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থা। আপাতত পাঁচ-সাতদিন ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গাদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হবে। তারপর তারা নিজেরাই রান্না করে খেতে পারবে।
৩০৬ রোহিঙ্গা ফিরে যাবে :চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের জলসীমা থেকে আটকের পর ৩০৬ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে রাখা হয়। তাদের মধ্যে পুরুষ ৯৭, নারী ১৭৬ ও শিশু ৩৩ জন। এদের শিগগিরই কক্সবাজার ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হতে পারে। কারণ তাদের অনেকের পরিবার-পরিজন কক্সবাজারে।
মোবাইল ফোন ব্যবহার :জানা গেছে, ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গারা মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাবে। একেকজন দুটি সিমকার্ড রাখতে পারবে। গতকাল অনেক
রোহিঙ্গার হাতে ফোন দেখা যায়। এ ছাড়া তারা শুধু নিজ ক্লাস্টার হাউসে নয়, ভাসানচরে ঘুরে বেড়াতে পারবে। নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় তাদের বন্দি অবস্থায় থাকতে হবে না। সংশ্নিষ্টরা জানান, যারা প্রথম দফায় ভাসানচরে এসেছে তারাই এখানে অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কাজ করবে। তাদের কাছে এখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা শুনে শিগগিরই আরও অনেক রোহিঙ্গা ভাসানচরে আসতে চাইবে। এরই মধ্যে একশ টনের বেশি খাবারসহ অন্যান্য রসদ রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে মজুদ রাখা হয়েছে। এগুলোর জোগান দিচ্ছে বিভিন্ন এনজিও।
ওরা এক রাত ছিল চট্টগ্রামে :ভাসানচরে যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে গত বৃহস্পতিবার গাড়িতে এনে চট্টগ্রামে রাখা হয়। চট্টগ্রামে
শাহিন স্কুলের ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, প্রথম ধাপে রোহিঙ্গারা যখন সেখানে গিয়ে দেখবে বসবাসের পরিবেশ ও অন্যান্য সুবিধা কক্সবাজারের তুলনায় অনেক ভালো, তখন আরও অনেক রোহিঙ্গা সেখানে যেতে চাইবে।
তিন মাসের খাবার মজুদ :প্রথম দফায় যাদের ভাসানচরে আনা হয়েছে তাদের জন্য খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ অন্তত তিন মাসের খাদ্যসামগ্রী দ্বীপটিতে মজুদ আছে। এ ছাড়া কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের জন্য এক বছরের রসদ মজুদ করা হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য নানা ধরনের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে দেশি-বিদেশি ২২টি সাহায্য সংস্থাকে যুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই সংস্থাগুলোর শতাধিক কর্মী এখন ভাসানচরে অবস্থান করছেন।
ভাসানচরের ভৌগোলিক অবস্থান :ভাসানচর বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার চরঈশ্বর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এর আয়তন ১৩ হাজার একর। দ্বীপটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে সাড়ে ছয় কিলোমিটার প্রশস্ত। ভাসানচরে বর্তমানে ব্যবহার উপযোগী ভূমি রয়েছে ছয় হাজার ৪২৭ একর। এর মধ্যে এক হাজার ৭০২ একর জমির ওপর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসন ও অন্যান্য স্থাপনার কাজে ৪৩২ একর ও ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ ও বনায়নের জন্য ৯১৮ একর ফাঁকা রাখা হয়েছে। ৩৫২ একর জমি ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর ফরওয়ার্ড বেইস তৈরির জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।






































