০৭:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
বিনিয়োগ অর্ধেকে তবুও পরিচালক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাড়ছে ঋণ

প্রি-অপারেশনাল ‘ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স’-এ শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ! (পর্ব-৩)

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৪:৫২:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
  • / ১০২৯৭ বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে- পাবলিকের কাছ থেকে অর্থ তুলে পরে সেই অর্থ এমন খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে স্বচ্ছতা কম, জবাবদিহিতা নেই, আর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ থাকে একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে। কখনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে, কখনো অ্যাসোসিয়েট বা পরিচালকদের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে বারবার। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মূল উদ্দেশ্য যেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য মুনাফা নিশ্চিত করা, সেখানে যদি সেই অর্থ ব্যবহৃত হয় প্রি-অপারেশনাল, লোকসানি কিংবা কার্যক্রমহীন প্রতিষ্ঠানে, তাহলে সেটি শুধু দুর্বল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে শাশা ডেনিমসের সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্য এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন: শাশা ডেনিমসের পাহাড়সম ঋণ: সুদের যাঁতাকলে তলানীতে মুনাফা!

এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির বিগত ৪-৫ বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে কিছু অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। তথ্য বিশ্লেষনে প্রশ্ন উঠছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আড়ালে সাবসিডিয়ারি ও অ্যাসোসিয়েট প্রতিষ্ঠানের নামে বিনিয়োগ, লোকসান সমন্বয়, শেয়ার হস্তান্তর এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিক ঋণ প্রদানের মাধ্যমে কি একই ধরনের অর্থচক্র গড়ে তোলা হচ্ছে? এরই ধারাবাহিকতায় শাশা ডেনিমস নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা আট পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষনে দেখা গেছে, শাশা ডেনিমস ২০২১ সালে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে সেই বিনিয়োগের প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু এরপরের কয়েক বছরে চিত্রটি দ্রুত বদলে যায়।

২০২৪ সালের জুন শেষে দেখা যায়, সেই বিনিয়োগ ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ২৯ হাজার ২১১ টাকায়। অর্থ্যাৎ, কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের নোট অনুযায়ী, ফ্লাই ঢাকা লোকসানে থাকায় বিনিয়োগ কমেছে ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৭ টাকা এবং ৩০ জুন ২০২৩ পর্যন্ত রিটেইনড আর্নিংসে সমন্বয় করা হয়েছে আরও ১ কোটি ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩২ টাকা।

কিন্তু পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে ২০২৫ সালে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৫ শেষে সেই বিনিয়োগ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ৩৪ হাজার ৭০১ টাকায়। অর্থ্যাৎ, শুরুতে ৫ কোটির বেশি বিনিয়োগ করে এখন প্রায় অর্ধেকেরও বেশি অর্থ গায়েব হয়ে গেছে। শুধু চলতি বছরেই নতুন করে লোকসান হয়েছে ৪৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। সব মিলিয়ে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সে শাশা ডেনিমসের মোট বিনিয়োগ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৬৫ হাজার ২৯৯ টাকা, যা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক ব্যর্থতা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। একটি কোম্পানি যেখানে কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি, ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে, সেখানে স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী বিনিয়োগ কমানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো প্রবণতা-বিনিয়োগ কমছে, কিন্তু ঋণ বাড়ছে। ২০২৪ সালে ‘ইন্টার কোম্পানি লোন’ হিসেবে যেখানে ফ্লাই ঢাকাকে দেওয়া হয়েছিল ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ১৯৪ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫২ লাখ ৬১ হাজার ৫৫৮ টাকা। অর্থ্যাৎ, লোকসানের গর্তে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানে আরও প্রায় ১ কোটি টাকা নতুন করে ঢালা হয়েছে।

এর বাইরে, ২০২২ সাল থেকেই ‘আদার লোন’ শিরোনামে শাশা ডেনিমসের আরেক অ্যাসোসিয়েট কোম্পানি এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশনও আরও ২ কোটি ৯৪ লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৫ টাকা ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সের কাছে পাওনা রয়েছে। অথচ এই এনার্জিস পাওয়ারেও শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ শুণ্যে নেমে এসেছে এবং বছরের পর বছর শাশা ডেনিমসে কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চলচে। সব মিলিয়ে একটি প্রি-অপারেশনাল, লোকসানি কোম্পানিতে শাশা ডেনিমসের অর্থের প্রবাহ যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তা এখন আর সাধারণ বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মুলত এখানে মুল কোম্পানি, সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ও অ্যাসোসিয়েট কোম্পানিতে ধারাবাহিক ঋণ প্রদানের মাধ্যমে একই ধরনের অর্থচক্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

এখানেই শেষ নয়। গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশনেসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক ঋণ লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। এক প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিট থেকে অর্থ বেরিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, সেখান থেকে আবার আরেক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হচ্ছে- এই চক্র যদি প্রকৃত উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়ে দায় লুকানো বা লোকসান ঢাকার কাজে লাগে, তবে সেটি কার্যত পঞ্জি স্কিমের মতো কাঠামো তৈরি করে। অর্থ্যাৎ নতুন অর্থ ঢুকিয়ে পুরোনো গর্ত ভরাট করা, কিন্তু সামগ্রিকভাবে গ্রুপের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া।

আরও পড়ুন: সাবসিডিয়ারির আড়ালে শাশা ডেনিমসের শত কোটি টাকা উধাও!

এসব বিষয়ে শাশা ডেনিমসের কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবসহ একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে লিখিত বক্তব্যে শাশা ডেনিমস জানায়, শাশা ডেনিমস বর্তমান ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলার জন্য ব্যবসায় ডাইভারসিফিকেশনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেই উদ্দেশ্যে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স লিমিটেডে শাশা ডেনিমস ৫.২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এবং কোম্পানি লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজননী সকল কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় অফিস স্থাপন, লোকবল নিয়োগ ইত্যাদি কার্যক্রম শুরু করে। উক্ত কার্যক্রমের ফলে কোম্পানি সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে এনওসি প্রাপ্ত হয় এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় এনওসি প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে এয়ারলাইন্স অপারেশন সার্টিফিকেট (এওসি) প্রাপ্তির জন্য প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করে। কিন্ত পরবর্তীতে দেশে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের ফলে এওসি কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় বাড়লেও কমছে লাভ: লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ!

শাশা ডেনিমস আরও জানায়, বর্তমানে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স তার ব্যবসাকে চলমান রাখার জন্য অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করছে যথা টিকেটিং সার্ভিস, কার্গো সেবা সার্ভিস ইত্যাদি। শাশা ডেনিমস তার প্রদানকৃত ঋনের জন্য বার্ষিক সাধারন সভায় উপস্থাপন ও অনুমোদন নিয়েছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রদানকৃত ঋনের উপর যথাযথ সুদ ধার্য্য এবং চার্জ করছেন। ২০২৪-২০২৫ সালে শাশা ডেনিমস নতুন করে কোন ঋণ ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সকে প্রদান করা হয় নাই। কিন্তু প্রদানকৃত ঋনের উপর সুদ ধার্য্যের ফলে ঋনের স্থিতির পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ফ্লাই ঢাকাএয়ারলাইন্সের প্রশাসনিক ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য কোম্পানির লোকসান হচ্ছে। এরইমধ্যে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স শাশা ডেনিমসের ঋন পরিশোধ শুরু করেছে এবং এই বছরের মধ্যে সমুদয় অর্থ (ঋণের সুদসহ) পরিশোধ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। যা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আদায় করা হবে। ইন্টারন্যাশানাল একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সের প্রফিট এবং লস কোম্পানীর বিনিয়োগের সাথে সমন্বিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু দুর্বল আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাতের ইঙ্গিতও দিতে পারে। যেখানে শাশা ডেনিমস নিজেই ঋণের সুদের চাপে রয়েছে, সেখানে তারা কেন একটি কার্যক্রমহীন প্রতিষ্ঠানে টাকা ঢালবে? এর পেছনে যদি শক্তিশালী ব্যবসায়িক যুক্তি না থাকে, তাহলে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, আমরা শেয়ার কিনেছি কোম্পানির মুনাফা থেকে ডিভিডেন্ড পাওয়ার জন্য। কিন্তু যদি সেই টাকা লোকসানি, অচল কোম্পানিতে ঢালা হয়, তাহলে এটা সরাসরি আমাদের সঙ্গে অন্যায়। তাদের মতে, এটা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত। যেখানে কোম্পানির নিজস্ব মুনাফা সুদের চাপে কমে যাচ্ছে, সেখানে এই ধরনের অর্থায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও পড়ুন: যমুনা ব্যাংকের মূলধনের ৮২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড: নগদ বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে- এই ঋণগুলো কি শর্তে দেওয়া হয়েছে? সুদহার কত? কোনো জামানত রয়েছে কি? অর্থ ফেরতের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা পরিকল্পনা কোথায়? এসব মৌলিক তথ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ না করা হলে, পুরো লেনদেনই অস্বচ্ছ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুযায়ী, এ ধরনের সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও যুক্তি তুলে ধরা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে সেই স্বচ্ছতা দৃশ্যমান নয়। যদিও এ বিষয়ে কোম্পানি তার লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত কিছু বলে নাই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এ.বি.এম মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘যদি কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি সাবসিডিয়ারি বা অ্যাসোসিয়েট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ দেখিয়ে পরে ধারাবাহিকভাবে সেই বিনিয়োগের মূল্য কমিয়ে ফেলে, কম দামে রিলেটেড পার্টির কাছে শেয়ার হস্তান্তর করে এবং একই সঙ্গে ঋণের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ চালু রাখে, তাহলে সেটি অবশ্যই গভীর পর্যালোচনার বিষয়।’

আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!

তিনি আরও বলেন, ‘কোম্পানিটি যেভাবে একটি প্রি-অপারেশনাল ও ধারাবাহিক লোকসানি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ধরে রাখছে এবং উল্টো আরও ঋণ দিচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়। এটি স্পষ্টতই কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। বিনিয়োগকারীদের অর্থ এমন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে স্থানান্তর করা হলে পুরো বাজারের প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত রিলেটেড পার্টি ট্রানজ্যাকশন, শেয়ার ভ্যালুয়েশন, এনএভি পতনের কারণ এবং ঋণ প্রদানের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা। সেইসাথে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যকলাপ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ পুঁজিবাজার কারও ব্যক্তিগত তহবিল নয়’- বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন: ইউসিবি: মুনাফার আড়ালে ঘাটতি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা!

এসব বিষয়ে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির এক সাবেক নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যদি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে অর্থ স্থানান্তর করে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। শাশা ডেনিমস এবং ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সের মধ্যকার এই লেনদেনের স্বচ্ছতা, শর্ত এবং যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রয়োজনে এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, কারণ এটি শুধুমাত্র একটি কোম্পানির ইস্যু নয়- এটি পুরো পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।’

তার মতে, ‘এ ধরনের কাঠামো সাধারণত দুইভাবে ব্যবহৃত হয়- এক, লোকসান লুকাতে; দুই, অর্থ স্থানান্তর করতে। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির অর্থ যদি গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘুরপাক খায় এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে তার প্রতিফলন না দেখা যায়, তাহলে সেটি কার্যত ‘ফান্ড রাউটিং’। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, এভাবেই অনেক সময় আর্থিক পঞ্জি স্কিমের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, নতুন অর্থ এনে পুরনো দায় সামলানো হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত অবিলম্বে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে পুরো অর্থপ্রবাহ ট্র্যাক করা।’

আরও পড়ুন: আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের ৬১ কোটি টাকার পাওনা আদায়ে অনিশ্চয়তা!

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা শেয়ার কিনেছি লাভের আশায়, কিন্তু শাশা ডেনিমস আমাদের টাকায় এমন একটি কোম্পানিকে টিকিয়ে রাখছে, যেটি এখনো কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি। ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সে এই ধরনের বিনিয়োগ আমাদের সঙ্গে সরাসরি অন্যায়। বিনিয়োগ কমছে, কিন্তু ঋণ বাড়ছে- এটা তো স্পষ্টতই আমাদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫.২৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ অর্ধেকে নামার পরও যদি আবার সেই প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়- যার কার্যক্রম শুরুই হয়নি, তাহলে এটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নির্মম প্রহসন। আমাদের টাকায় কোম্পানি সাবসিডিয়ারি কিংবা অ্যাসোসিয়েট কোম্পানি গড়ে, পরে লোকসান দেখিয়ে শেয়ার নিজেদের আরেক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দেয়, আবার ঋণের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়- এটা সরাসরি সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থবিরোধী কাজ। আমরা অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার দাবি জানাচ্ছি।’ (চলবে…)

শেয়ার করুন

বিনিয়োগ অর্ধেকে তবুও পরিচালক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাড়ছে ঋণ

প্রি-অপারেশনাল ‘ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স’-এ শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ! (পর্ব-৩)

আপডেট: ০৪:৫২:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে- পাবলিকের কাছ থেকে অর্থ তুলে পরে সেই অর্থ এমন খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে স্বচ্ছতা কম, জবাবদিহিতা নেই, আর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ থাকে একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে। কখনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে, কখনো অ্যাসোসিয়েট বা পরিচালকদের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে বারবার। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মূল উদ্দেশ্য যেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য মুনাফা নিশ্চিত করা, সেখানে যদি সেই অর্থ ব্যবহৃত হয় প্রি-অপারেশনাল, লোকসানি কিংবা কার্যক্রমহীন প্রতিষ্ঠানে, তাহলে সেটি শুধু দুর্বল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে শাশা ডেনিমসের সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্য এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন: শাশা ডেনিমসের পাহাড়সম ঋণ: সুদের যাঁতাকলে তলানীতে মুনাফা!

এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির বিগত ৪-৫ বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে কিছু অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। তথ্য বিশ্লেষনে প্রশ্ন উঠছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আড়ালে সাবসিডিয়ারি ও অ্যাসোসিয়েট প্রতিষ্ঠানের নামে বিনিয়োগ, লোকসান সমন্বয়, শেয়ার হস্তান্তর এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিক ঋণ প্রদানের মাধ্যমে কি একই ধরনের অর্থচক্র গড়ে তোলা হচ্ছে? এরই ধারাবাহিকতায় শাশা ডেনিমস নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা আট পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষনে দেখা গেছে, শাশা ডেনিমস ২০২১ সালে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে সেই বিনিয়োগের প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু এরপরের কয়েক বছরে চিত্রটি দ্রুত বদলে যায়।

২০২৪ সালের জুন শেষে দেখা যায়, সেই বিনিয়োগ ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ২৯ হাজার ২১১ টাকায়। অর্থ্যাৎ, কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের নোট অনুযায়ী, ফ্লাই ঢাকা লোকসানে থাকায় বিনিয়োগ কমেছে ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৭ টাকা এবং ৩০ জুন ২০২৩ পর্যন্ত রিটেইনড আর্নিংসে সমন্বয় করা হয়েছে আরও ১ কোটি ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩২ টাকা।

কিন্তু পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে ২০২৫ সালে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৫ শেষে সেই বিনিয়োগ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ৩৪ হাজার ৭০১ টাকায়। অর্থ্যাৎ, শুরুতে ৫ কোটির বেশি বিনিয়োগ করে এখন প্রায় অর্ধেকেরও বেশি অর্থ গায়েব হয়ে গেছে। শুধু চলতি বছরেই নতুন করে লোকসান হয়েছে ৪৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। সব মিলিয়ে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সে শাশা ডেনিমসের মোট বিনিয়োগ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৬৫ হাজার ২৯৯ টাকা, যা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক ব্যর্থতা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। একটি কোম্পানি যেখানে কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি, ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে, সেখানে স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী বিনিয়োগ কমানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো প্রবণতা-বিনিয়োগ কমছে, কিন্তু ঋণ বাড়ছে। ২০২৪ সালে ‘ইন্টার কোম্পানি লোন’ হিসেবে যেখানে ফ্লাই ঢাকাকে দেওয়া হয়েছিল ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ১৯৪ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫২ লাখ ৬১ হাজার ৫৫৮ টাকা। অর্থ্যাৎ, লোকসানের গর্তে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানে আরও প্রায় ১ কোটি টাকা নতুন করে ঢালা হয়েছে।

এর বাইরে, ২০২২ সাল থেকেই ‘আদার লোন’ শিরোনামে শাশা ডেনিমসের আরেক অ্যাসোসিয়েট কোম্পানি এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশনও আরও ২ কোটি ৯৪ লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৫ টাকা ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সের কাছে পাওনা রয়েছে। অথচ এই এনার্জিস পাওয়ারেও শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ শুণ্যে নেমে এসেছে এবং বছরের পর বছর শাশা ডেনিমসে কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চলচে। সব মিলিয়ে একটি প্রি-অপারেশনাল, লোকসানি কোম্পানিতে শাশা ডেনিমসের অর্থের প্রবাহ যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তা এখন আর সাধারণ বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মুলত এখানে মুল কোম্পানি, সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ও অ্যাসোসিয়েট কোম্পানিতে ধারাবাহিক ঋণ প্রদানের মাধ্যমে একই ধরনের অর্থচক্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

এখানেই শেষ নয়। গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশনেসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক ঋণ লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। এক প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিট থেকে অর্থ বেরিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, সেখান থেকে আবার আরেক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হচ্ছে- এই চক্র যদি প্রকৃত উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়ে দায় লুকানো বা লোকসান ঢাকার কাজে লাগে, তবে সেটি কার্যত পঞ্জি স্কিমের মতো কাঠামো তৈরি করে। অর্থ্যাৎ নতুন অর্থ ঢুকিয়ে পুরোনো গর্ত ভরাট করা, কিন্তু সামগ্রিকভাবে গ্রুপের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া।

আরও পড়ুন: সাবসিডিয়ারির আড়ালে শাশা ডেনিমসের শত কোটি টাকা উধাও!

এসব বিষয়ে শাশা ডেনিমসের কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবসহ একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে লিখিত বক্তব্যে শাশা ডেনিমস জানায়, শাশা ডেনিমস বর্তমান ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলার জন্য ব্যবসায় ডাইভারসিফিকেশনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেই উদ্দেশ্যে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স লিমিটেডে শাশা ডেনিমস ৫.২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এবং কোম্পানি লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজননী সকল কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় অফিস স্থাপন, লোকবল নিয়োগ ইত্যাদি কার্যক্রম শুরু করে। উক্ত কার্যক্রমের ফলে কোম্পানি সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে এনওসি প্রাপ্ত হয় এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় এনওসি প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে এয়ারলাইন্স অপারেশন সার্টিফিকেট (এওসি) প্রাপ্তির জন্য প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করে। কিন্ত পরবর্তীতে দেশে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের ফলে এওসি কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় বাড়লেও কমছে লাভ: লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ!

শাশা ডেনিমস আরও জানায়, বর্তমানে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স তার ব্যবসাকে চলমান রাখার জন্য অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করছে যথা টিকেটিং সার্ভিস, কার্গো সেবা সার্ভিস ইত্যাদি। শাশা ডেনিমস তার প্রদানকৃত ঋনের জন্য বার্ষিক সাধারন সভায় উপস্থাপন ও অনুমোদন নিয়েছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রদানকৃত ঋনের উপর যথাযথ সুদ ধার্য্য এবং চার্জ করছেন। ২০২৪-২০২৫ সালে শাশা ডেনিমস নতুন করে কোন ঋণ ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সকে প্রদান করা হয় নাই। কিন্তু প্রদানকৃত ঋনের উপর সুদ ধার্য্যের ফলে ঋনের স্থিতির পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ফ্লাই ঢাকাএয়ারলাইন্সের প্রশাসনিক ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য কোম্পানির লোকসান হচ্ছে। এরইমধ্যে ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স শাশা ডেনিমসের ঋন পরিশোধ শুরু করেছে এবং এই বছরের মধ্যে সমুদয় অর্থ (ঋণের সুদসহ) পরিশোধ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। যা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আদায় করা হবে। ইন্টারন্যাশানাল একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সের প্রফিট এবং লস কোম্পানীর বিনিয়োগের সাথে সমন্বিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু দুর্বল আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাতের ইঙ্গিতও দিতে পারে। যেখানে শাশা ডেনিমস নিজেই ঋণের সুদের চাপে রয়েছে, সেখানে তারা কেন একটি কার্যক্রমহীন প্রতিষ্ঠানে টাকা ঢালবে? এর পেছনে যদি শক্তিশালী ব্যবসায়িক যুক্তি না থাকে, তাহলে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, আমরা শেয়ার কিনেছি কোম্পানির মুনাফা থেকে ডিভিডেন্ড পাওয়ার জন্য। কিন্তু যদি সেই টাকা লোকসানি, অচল কোম্পানিতে ঢালা হয়, তাহলে এটা সরাসরি আমাদের সঙ্গে অন্যায়। তাদের মতে, এটা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত। যেখানে কোম্পানির নিজস্ব মুনাফা সুদের চাপে কমে যাচ্ছে, সেখানে এই ধরনের অর্থায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও পড়ুন: যমুনা ব্যাংকের মূলধনের ৮২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড: নগদ বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে- এই ঋণগুলো কি শর্তে দেওয়া হয়েছে? সুদহার কত? কোনো জামানত রয়েছে কি? অর্থ ফেরতের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা পরিকল্পনা কোথায়? এসব মৌলিক তথ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ না করা হলে, পুরো লেনদেনই অস্বচ্ছ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুযায়ী, এ ধরনের সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও যুক্তি তুলে ধরা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে সেই স্বচ্ছতা দৃশ্যমান নয়। যদিও এ বিষয়ে কোম্পানি তার লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত কিছু বলে নাই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এ.বি.এম মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘যদি কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি সাবসিডিয়ারি বা অ্যাসোসিয়েট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ দেখিয়ে পরে ধারাবাহিকভাবে সেই বিনিয়োগের মূল্য কমিয়ে ফেলে, কম দামে রিলেটেড পার্টির কাছে শেয়ার হস্তান্তর করে এবং একই সঙ্গে ঋণের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ চালু রাখে, তাহলে সেটি অবশ্যই গভীর পর্যালোচনার বিষয়।’

আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!

তিনি আরও বলেন, ‘কোম্পানিটি যেভাবে একটি প্রি-অপারেশনাল ও ধারাবাহিক লোকসানি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ধরে রাখছে এবং উল্টো আরও ঋণ দিচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়। এটি স্পষ্টতই কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। বিনিয়োগকারীদের অর্থ এমন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে স্থানান্তর করা হলে পুরো বাজারের প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত রিলেটেড পার্টি ট্রানজ্যাকশন, শেয়ার ভ্যালুয়েশন, এনএভি পতনের কারণ এবং ঋণ প্রদানের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা। সেইসাথে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যকলাপ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ পুঁজিবাজার কারও ব্যক্তিগত তহবিল নয়’- বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন: ইউসিবি: মুনাফার আড়ালে ঘাটতি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা!

এসব বিষয়ে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির এক সাবেক নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যদি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে অর্থ স্থানান্তর করে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। শাশা ডেনিমস এবং ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সের মধ্যকার এই লেনদেনের স্বচ্ছতা, শর্ত এবং যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রয়োজনে এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, কারণ এটি শুধুমাত্র একটি কোম্পানির ইস্যু নয়- এটি পুরো পুঁজিবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।’

তার মতে, ‘এ ধরনের কাঠামো সাধারণত দুইভাবে ব্যবহৃত হয়- এক, লোকসান লুকাতে; দুই, অর্থ স্থানান্তর করতে। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির অর্থ যদি গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘুরপাক খায় এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে তার প্রতিফলন না দেখা যায়, তাহলে সেটি কার্যত ‘ফান্ড রাউটিং’। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, এভাবেই অনেক সময় আর্থিক পঞ্জি স্কিমের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, নতুন অর্থ এনে পুরনো দায় সামলানো হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত অবিলম্বে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে পুরো অর্থপ্রবাহ ট্র্যাক করা।’

আরও পড়ুন: আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের ৬১ কোটি টাকার পাওনা আদায়ে অনিশ্চয়তা!

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা শেয়ার কিনেছি লাভের আশায়, কিন্তু শাশা ডেনিমস আমাদের টাকায় এমন একটি কোম্পানিকে টিকিয়ে রাখছে, যেটি এখনো কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি। ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্সে এই ধরনের বিনিয়োগ আমাদের সঙ্গে সরাসরি অন্যায়। বিনিয়োগ কমছে, কিন্তু ঋণ বাড়ছে- এটা তো স্পষ্টতই আমাদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫.২৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ অর্ধেকে নামার পরও যদি আবার সেই প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়- যার কার্যক্রম শুরুই হয়নি, তাহলে এটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নির্মম প্রহসন। আমাদের টাকায় কোম্পানি সাবসিডিয়ারি কিংবা অ্যাসোসিয়েট কোম্পানি গড়ে, পরে লোকসান দেখিয়ে শেয়ার নিজেদের আরেক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দেয়, আবার ঋণের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়- এটা সরাসরি সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থবিরোধী কাজ। আমরা অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার দাবি জানাচ্ছি।’ (চলবে…)