১০:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
বিনিয়োগ ফেরতে লাগবে ১,৪৬৬ বছর তবুও ১১৪ শতাংশ দর বৃদ্ধি

ভয়ংকর সিন্ডিকেটের ফাঁদে ডমিনেজ স্টীলের বিনিয়োগকারীরা! (পর্ব-১)

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৯:৪৫:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • / ১০২৩৬ বার দেখা হয়েছে

ফাইল ফটো

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার ইতিহাস নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এক শ্রেণির দুর্বৃত্তচক্র দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কৃত্রিম কারসাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সেই পুরোনো কারসাজির নতুন শিকার হয়ে উঠেছে ডমিনেজ স্টীল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেড। কাগজে-কলমে দুর্বল আর্থিক অবস্থা, টানা লোকসান, উৎপাদন বন্ধ, নগদ সংকট, শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় শূন্যের কোঠায়- সবকিছুকে উপেক্ষা করে কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে আকাশে তোলা হয়েছে। এতে আবারও প্রশ্ন উঠেছে- পুঁজিবাজার কি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য, নাকি একটি সংঘবদ্ধ কারসাজি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে?

আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস: অদক্ষ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় লোকসান ১৫ কোটি টাকা!

আর এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম, লেনদেনের তথ্য ও ২০২৪-২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। প্রাপ্ত তথ্যের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে তথ্য গোপন, লোকসান সত্বেও অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি, কাগুজে মুনাফার প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তারল্য সঙ্কট, অনিয়ন্ত্রিত পাওনা ও এর আদায়ে ধীরগতি ও আর্থিক অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এরই ধারাবাহিকতায় ডমিনেজ স্টীল বিল্ডিং সিস্টেমস নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা ছয় পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের উপর বেইজ করে গতকাল রোববার ১০ মে ২০২৬ পর্যন্ত কোম্পানিটির পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ ১,৪৬৬। অর্থ্যাৎ কোম্পানিটির বর্তমান আয়ের ভিত্তিতে একজন বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে অপেক্ষা করতে হবে প্রায় ১,৪৬৬ বছর! বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক বাজারে এ ধরনের পিই রেশিওকে বিনিয়োগযোগ্য তো দূরের কথা, ভয়াবহ বিপদসংকেত হিসেবে দেখা হয়। বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘এটি আর বিনিয়োগ নয়, এটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নির্মম তামাশা।’

আরও পড়ুন: প্রি-অপারেশনাল ‘ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স’-এ শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ!

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ আরও তীব্র। কেউ বলছেন, আমরা কি তাহলে নাতি-পুতির জন্য বিনিয়োগ করেছি? আবার কেউ বলছেন, এক জীবনে তো দূরের কথা, কয়েক প্রজন্মেও এই বিনিয়োগ ফেরত আসবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে কোম্পানির ব্যবসা দুর্বল, উৎপাদন বন্ধ, আয় প্রায় শূন্য, সেই কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ করে কেন উড়ছে? কারা দাম বাড়াচ্ছে? আর কার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে?

ডিএসই’র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র তিন মাস আগে অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৩৪.৩০ টাকা। আর গতকাল রোববার ১০ মে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩.৩০ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে শেয়ারদর বেড়েছে ৩৯ টাকা বা প্রায় ১১৪ শতাংশ। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, মাত্র ২০ কার্যদিবস আগে শেয়ারটির দাম ছিল ৫১.১০ টাকা, যা এখন ৭৩.৩০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ২০ কার্যদিবসে দাম বেড়েছে ২২.২০ টাকা বা প্রায় ৪৩.৪৪ শতাংশ।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের উল্লম্ফন কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। কারণ কোম্পানিটির ব্যবসায়িক ভিত্তি বা আর্থিক সক্ষমতায় এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, যা এই মূল্যবৃদ্ধিকে সমর্থন করে। বরং বাস্তবতা পুরোপুরি উল্টো। কোম্পানিটি সর্বশেষ টানা তিন প্রান্তিক লোকসান গুনেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৭ পয়সা। গত তিন বছরে শেয়ারপ্রতি আয় ৫ পয়সার ওপরে উঠতে পারেনি। ২০২৩ সালে ইপিএস ছিল ৪ পয়সা, ২০২৪ সালে ৩ পয়সা এবং ২০২৫ সালে মাত্র ৫ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানিটি কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। অথচ সেই কোম্পানির শেয়ারদর রকেট গতিতে বাড়ছে।

আরও পড়ুন: উল্টোরথে নাভানা ফার্মার আয়: সুদের যাঁতাকলে পিষ্ট বিনিয়োগকারীরা

বিশ্লেষকদের মতে, এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি কারসাজির ছক। প্রথমে একটি দুর্বল কোম্পানিকে বেছে নেওয়া হয়। এরপর গোপনে সিন্ডিকেট শেয়ার সংগ্রহ করে। তারপর কৃত্রিমভাবে লেনদেন বাড়িয়ে বাজারে চাহিদার ভান সৃষ্টি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্রোকারেজ হাউস এবং বিভিন্ন গুজবের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। সাধারণ মানুষ যখন ‘আরও বাড়বে’ ভেবে উচ্চ দামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখনই সিন্ডিকেট শেয়ার বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা তুলে নেয়। শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।

আরও পড়ুন: ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় বাড়লেও কমছে লাভ: লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ!

বাজারে অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে শেয়ারটির দাম বাড়িয়েছে। আর আশঙ্কার বিষয় হলো- নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ সবকিছু দেখেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন- তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কী?

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, কোম্পানিটি নীরবে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হলে তা অবিলম্বে বিনিয়োগকারীদের জানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু ডমিনেজ স্টীল সেই নিয়ম মানেনি। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা যখন বাজারে উচ্চ দামে শেয়ার কিনছিলেন, তখন তারা জানতেনই না যে কোম্পানির কারখানায় উৎপাদন বন্ধ!

আরও পড়ুন: ইনডেক্স অ্যাগ্রোর ‘লাভের গল্প’: আটকে গেছে শ্রমিকদের পাওনা! 

পরবর্তীতে ডিএসইর প্রতিনিধিদল সরেজমিনে আশুলিয়া ও নরসিংদীর কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে উৎপাদন বন্ধ থাকার তথ্য পায়। গত ৩ ও ৪ নভেম্বর পরিচালিত ওই পরিদর্শনে দুই কারখানার মধ্যে পলাশ নরসিংদীর কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ দেখতে পায় ডিএসই। আর আশুলিয়ার সাভারের কারখানায় নামমাত্র উৎপাদন চলমান রয়েছে। এরপর সংস্থাটি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-কারখানা বন্ধ থাকার মতো এতো বড় তথ্য কোম্পানি কেন গোপন করলো? এটি কি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা নয়?

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শেয়ারদর বাড়তে থাকা অত্যন্ত সন্দেহজনক। কারণ কোনো সুস্থ কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবসা বাড়লে শেয়ারদর বাড়ে। কিন্তু এখানে ব্যবসা বন্ধ, আয় নেই, লোকসান বাড়ছে- তারপরও দাম বাড়ছে। এর অর্থ হলো, বাজারের স্বাভাবিক শক্তি নয়, কৃত্রিম শক্তি কাজ করছে।

কোম্পানিটির অতীত ইতিহাসও প্রশ্নবিদ্ধ। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের সময় ২০২০ সালে কোম্পানিটি আইপিও অনুমোদন পায়। অথচ তখন থেকেই কোম্পানিটির মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। দুর্বল আর্থিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এটি অনুমোদন পেলো- সেই প্রশ্ন এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!

আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এজন্য ৩ কোটি শেয়ার বিক্রি করা হয়। কিন্তু তালিকাভুক্তির কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানিটি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে নেমে যায়। যে কোম্পানি বড় মুনাফার স্বপ্ন দেখিয়ে বাজারে এসেছিল, সেই কোম্পানি এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ বছরে ১ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার সামর্থ্যও তাদের হয়নি।

আরও বিতর্ক রয়েছে ইস্যু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিয়েও। কোম্পানিটিকে বাজারে আনার দায়িত্বে ছিল বিতর্কিত শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজম্যান্ট লিমিটেড। বাজারে অভিযোগ রয়েছে, অতীতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার কারণে নিম্নমানের বহু কোম্পানি বাজারে আনার সুযোগ পেয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- ডমিনেজ স্টীল কি শুরু থেকেই একটি ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ প্রকল্প ছিল?

আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মার আর্থিক হিসাবে সংখ্যার খেলা: বিভ্রান্তিতে বিনিয়োগকারীরা

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো তথ্য গোপন করা। কারণ একজন বিনিয়োগকারী সিদ্ধান্ত নেন কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু যদি কোম্পানি উৎপাদন বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে, তাহলে তা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এতে শুধু একটি কোম্পানি নয়, পুরো বাজারের ওপর আস্থা নষ্ট হয়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই ভয়ংকর কারসাজির দায় কে নেবে? যারা কৃত্রিমভাবে শেয়ারদর বাড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? উৎপাদন বন্ধ রেখে তথ্য গোপন করায় কোম্পানির পরিচালকদের বিরুদ্ধে কি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আর যেসব নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এতোদিন নীরব ছিল, তাদের জবাবদিহি কোথায়? কারণ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রতিবার একই নাটক মঞ্চস্থ হয়। প্রথমে দুর্বল কোম্পানিকে বাজারে আনা হয়। এরপর কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। সাধারণ মানুষ লোভে পড়ে বিনিয়োগ করে। তারপর সিন্ডিকেট টাকা তুলে বেরিয়ে যায়। আর শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। ডমিনেজ স্টীলের ঘটনাও যেন সেই পুরোনো প্রতারণার নতুন সংস্করণ।

বিনিয়োগকারীরা এখন বলছেন, যদি উৎপাদন বন্ধ থাকা, টানা লোকসান, শূন্যের কাছাকাছি আয় এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বাজারে আস্থা ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ একটি বাজার তখনই টিকে থাকে, যখন সেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার থাকে। অন্যথায় পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কাছে ‘বিনিয়োগের জায়গা’ নয়, বরং ‘প্রতারণার ফাঁদ’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন: যমুনা ব্যাংকের মূলধনের ৮২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড: নগদ বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই’র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডমিনেজ স্টীলের ঘটনা শুধু একটি কোম্পানির সমস্যা নয়, এটি পুরো বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একটি কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ, আয় নেই, টানা লোকসান- তারপরও শেয়ারদর ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়! এটি কোনো স্বাভাবিক বাজার আচরণ নয়। এর মানে হলো বাজারে তথ্য গোপন, কৃত্রিম লেনদেন এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক কারসাজি এখনও ভয়াবহভাবে সক্রিয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবসময় শেষ মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হন। যারা কারসাজি করে তারা আগেই বেরিয়ে যায়, আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর আটকে থাকেন। শুধু কারখানা পরিদর্শন আর ডিএসই’র ওয়েবসেইটে উৎপাদন বন্ধের তথ্য প্রকাশ করলেই হবে না- যদি এখনই কঠোর নজরদারি ও উদাহরণমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে বাজারে আস্থা ফেরানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।’

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডমিনেজ স্টীলের মতো একটি দুর্বল, লোকসানি এবং কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানির শেয়ার কীভাবে দিনের পর দিন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে- এটা পুরো বাজারের জন্য ভয়ংকর বার্তা। এখানে স্পষ্টভাবেই একটি সংঘবদ্ধ কারসাজি চক্র সক্রিয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সামনে কৃত্রিমভাবে লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, অথচ বাস্তবে কোম্পানির কারখানাই বন্ধ। এটা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা।’

আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বহুবার বলেছি, বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে যারা দুর্বল কোম্পানি বেছে নিয়ে দাম বাড়ায়, তারপর সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা তুলে নেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ পুঁজিবাজার থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’

বিএসইসির এক সাবেক নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডমিনেজ স্টীলের মতো কোম্পানিগুলো বাজারে আসার সময় থেকেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু অতীতে নানা প্রভাব ও চাপের কারণে অনেক দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তির সুযোগ পেয়েছে। এখন তার ফল ভোগ করছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ রেখে সেই তথ্য গোপন করবে- এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ ধরনের ঘটনায় পরিচালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক তদন্ত, জরিমানা এমনকি ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। কিন্তু আমাদের বাজারে অনেক ক্ষেত্রেই দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে অসাধু গোষ্ঠীগুলো বারবার একই কৌশল ব্যবহার করার সাহস পাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের প্রতারণা কখনোই বন্ধ হবে না।’

আরও পড়ুন: ইউসিবি: মুনাফার আড়ালে ঘাটতি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা!

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করতে কমিশন সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো কোম্পানি যদি প্রচলিত সিকিউরিটিজ আইন, তালিকাভুক্তি বিধিমালা বা তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকে, তাহলে কমিশন প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন বা কারসাজির অভিযোগের বিষয়েও কমিশনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’

বিএসইসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সবসময় গুজব বা অপ্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি, আর্থিক সক্ষমতা ও প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কমিশন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।’ (চলবে…)

বিজনেস জার্নাল/এইচকে

শেয়ার করুন

বিনিয়োগ ফেরতে লাগবে ১,৪৬৬ বছর তবুও ১১৪ শতাংশ দর বৃদ্ধি

ভয়ংকর সিন্ডিকেটের ফাঁদে ডমিনেজ স্টীলের বিনিয়োগকারীরা! (পর্ব-১)

আপডেট: ০৯:৪৫:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার ইতিহাস নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এক শ্রেণির দুর্বৃত্তচক্র দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কৃত্রিম কারসাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সেই পুরোনো কারসাজির নতুন শিকার হয়ে উঠেছে ডমিনেজ স্টীল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেড। কাগজে-কলমে দুর্বল আর্থিক অবস্থা, টানা লোকসান, উৎপাদন বন্ধ, নগদ সংকট, শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় শূন্যের কোঠায়- সবকিছুকে উপেক্ষা করে কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে আকাশে তোলা হয়েছে। এতে আবারও প্রশ্ন উঠেছে- পুঁজিবাজার কি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য, নাকি একটি সংঘবদ্ধ কারসাজি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে?

আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস: অদক্ষ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় লোকসান ১৫ কোটি টাকা!

আর এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম, লেনদেনের তথ্য ও ২০২৪-২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। প্রাপ্ত তথ্যের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে তথ্য গোপন, লোকসান সত্বেও অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি, কাগুজে মুনাফার প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তারল্য সঙ্কট, অনিয়ন্ত্রিত পাওনা ও এর আদায়ে ধীরগতি ও আর্থিক অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এরই ধারাবাহিকতায় ডমিনেজ স্টীল বিল্ডিং সিস্টেমস নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা ছয় পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের উপর বেইজ করে গতকাল রোববার ১০ মে ২০২৬ পর্যন্ত কোম্পানিটির পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ ১,৪৬৬। অর্থ্যাৎ কোম্পানিটির বর্তমান আয়ের ভিত্তিতে একজন বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে অপেক্ষা করতে হবে প্রায় ১,৪৬৬ বছর! বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক বাজারে এ ধরনের পিই রেশিওকে বিনিয়োগযোগ্য তো দূরের কথা, ভয়াবহ বিপদসংকেত হিসেবে দেখা হয়। বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘এটি আর বিনিয়োগ নয়, এটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নির্মম তামাশা।’

আরও পড়ুন: প্রি-অপারেশনাল ‘ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স’-এ শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ!

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ আরও তীব্র। কেউ বলছেন, আমরা কি তাহলে নাতি-পুতির জন্য বিনিয়োগ করেছি? আবার কেউ বলছেন, এক জীবনে তো দূরের কথা, কয়েক প্রজন্মেও এই বিনিয়োগ ফেরত আসবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে কোম্পানির ব্যবসা দুর্বল, উৎপাদন বন্ধ, আয় প্রায় শূন্য, সেই কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ করে কেন উড়ছে? কারা দাম বাড়াচ্ছে? আর কার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে?

ডিএসই’র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র তিন মাস আগে অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৩৪.৩০ টাকা। আর গতকাল রোববার ১০ মে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩.৩০ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে শেয়ারদর বেড়েছে ৩৯ টাকা বা প্রায় ১১৪ শতাংশ। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, মাত্র ২০ কার্যদিবস আগে শেয়ারটির দাম ছিল ৫১.১০ টাকা, যা এখন ৭৩.৩০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ২০ কার্যদিবসে দাম বেড়েছে ২২.২০ টাকা বা প্রায় ৪৩.৪৪ শতাংশ।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের উল্লম্ফন কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। কারণ কোম্পানিটির ব্যবসায়িক ভিত্তি বা আর্থিক সক্ষমতায় এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, যা এই মূল্যবৃদ্ধিকে সমর্থন করে। বরং বাস্তবতা পুরোপুরি উল্টো। কোম্পানিটি সর্বশেষ টানা তিন প্রান্তিক লোকসান গুনেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৭ পয়সা। গত তিন বছরে শেয়ারপ্রতি আয় ৫ পয়সার ওপরে উঠতে পারেনি। ২০২৩ সালে ইপিএস ছিল ৪ পয়সা, ২০২৪ সালে ৩ পয়সা এবং ২০২৫ সালে মাত্র ৫ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানিটি কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। অথচ সেই কোম্পানির শেয়ারদর রকেট গতিতে বাড়ছে।

আরও পড়ুন: উল্টোরথে নাভানা ফার্মার আয়: সুদের যাঁতাকলে পিষ্ট বিনিয়োগকারীরা

বিশ্লেষকদের মতে, এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি কারসাজির ছক। প্রথমে একটি দুর্বল কোম্পানিকে বেছে নেওয়া হয়। এরপর গোপনে সিন্ডিকেট শেয়ার সংগ্রহ করে। তারপর কৃত্রিমভাবে লেনদেন বাড়িয়ে বাজারে চাহিদার ভান সৃষ্টি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্রোকারেজ হাউস এবং বিভিন্ন গুজবের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। সাধারণ মানুষ যখন ‘আরও বাড়বে’ ভেবে উচ্চ দামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখনই সিন্ডিকেট শেয়ার বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা তুলে নেয়। শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।

আরও পড়ুন: ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় বাড়লেও কমছে লাভ: লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ!

বাজারে অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে শেয়ারটির দাম বাড়িয়েছে। আর আশঙ্কার বিষয় হলো- নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ সবকিছু দেখেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন- তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কী?

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, কোম্পানিটি নীরবে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হলে তা অবিলম্বে বিনিয়োগকারীদের জানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু ডমিনেজ স্টীল সেই নিয়ম মানেনি। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা যখন বাজারে উচ্চ দামে শেয়ার কিনছিলেন, তখন তারা জানতেনই না যে কোম্পানির কারখানায় উৎপাদন বন্ধ!

আরও পড়ুন: ইনডেক্স অ্যাগ্রোর ‘লাভের গল্প’: আটকে গেছে শ্রমিকদের পাওনা! 

পরবর্তীতে ডিএসইর প্রতিনিধিদল সরেজমিনে আশুলিয়া ও নরসিংদীর কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে উৎপাদন বন্ধ থাকার তথ্য পায়। গত ৩ ও ৪ নভেম্বর পরিচালিত ওই পরিদর্শনে দুই কারখানার মধ্যে পলাশ নরসিংদীর কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ দেখতে পায় ডিএসই। আর আশুলিয়ার সাভারের কারখানায় নামমাত্র উৎপাদন চলমান রয়েছে। এরপর সংস্থাটি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-কারখানা বন্ধ থাকার মতো এতো বড় তথ্য কোম্পানি কেন গোপন করলো? এটি কি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা নয়?

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শেয়ারদর বাড়তে থাকা অত্যন্ত সন্দেহজনক। কারণ কোনো সুস্থ কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবসা বাড়লে শেয়ারদর বাড়ে। কিন্তু এখানে ব্যবসা বন্ধ, আয় নেই, লোকসান বাড়ছে- তারপরও দাম বাড়ছে। এর অর্থ হলো, বাজারের স্বাভাবিক শক্তি নয়, কৃত্রিম শক্তি কাজ করছে।

কোম্পানিটির অতীত ইতিহাসও প্রশ্নবিদ্ধ। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের সময় ২০২০ সালে কোম্পানিটি আইপিও অনুমোদন পায়। অথচ তখন থেকেই কোম্পানিটির মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। দুর্বল আর্থিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এটি অনুমোদন পেলো- সেই প্রশ্ন এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!

আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এজন্য ৩ কোটি শেয়ার বিক্রি করা হয়। কিন্তু তালিকাভুক্তির কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানিটি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে নেমে যায়। যে কোম্পানি বড় মুনাফার স্বপ্ন দেখিয়ে বাজারে এসেছিল, সেই কোম্পানি এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ বছরে ১ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার সামর্থ্যও তাদের হয়নি।

আরও বিতর্ক রয়েছে ইস্যু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিয়েও। কোম্পানিটিকে বাজারে আনার দায়িত্বে ছিল বিতর্কিত শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজম্যান্ট লিমিটেড। বাজারে অভিযোগ রয়েছে, অতীতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার কারণে নিম্নমানের বহু কোম্পানি বাজারে আনার সুযোগ পেয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- ডমিনেজ স্টীল কি শুরু থেকেই একটি ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ প্রকল্প ছিল?

আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মার আর্থিক হিসাবে সংখ্যার খেলা: বিভ্রান্তিতে বিনিয়োগকারীরা

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো তথ্য গোপন করা। কারণ একজন বিনিয়োগকারী সিদ্ধান্ত নেন কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু যদি কোম্পানি উৎপাদন বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে, তাহলে তা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এতে শুধু একটি কোম্পানি নয়, পুরো বাজারের ওপর আস্থা নষ্ট হয়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই ভয়ংকর কারসাজির দায় কে নেবে? যারা কৃত্রিমভাবে শেয়ারদর বাড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? উৎপাদন বন্ধ রেখে তথ্য গোপন করায় কোম্পানির পরিচালকদের বিরুদ্ধে কি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আর যেসব নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এতোদিন নীরব ছিল, তাদের জবাবদিহি কোথায়? কারণ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রতিবার একই নাটক মঞ্চস্থ হয়। প্রথমে দুর্বল কোম্পানিকে বাজারে আনা হয়। এরপর কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। সাধারণ মানুষ লোভে পড়ে বিনিয়োগ করে। তারপর সিন্ডিকেট টাকা তুলে বেরিয়ে যায়। আর শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। ডমিনেজ স্টীলের ঘটনাও যেন সেই পুরোনো প্রতারণার নতুন সংস্করণ।

বিনিয়োগকারীরা এখন বলছেন, যদি উৎপাদন বন্ধ থাকা, টানা লোকসান, শূন্যের কাছাকাছি আয় এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বাজারে আস্থা ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ একটি বাজার তখনই টিকে থাকে, যখন সেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার থাকে। অন্যথায় পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কাছে ‘বিনিয়োগের জায়গা’ নয়, বরং ‘প্রতারণার ফাঁদ’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন: যমুনা ব্যাংকের মূলধনের ৮২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড: নগদ বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই’র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডমিনেজ স্টীলের ঘটনা শুধু একটি কোম্পানির সমস্যা নয়, এটি পুরো বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একটি কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ, আয় নেই, টানা লোকসান- তারপরও শেয়ারদর ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়! এটি কোনো স্বাভাবিক বাজার আচরণ নয়। এর মানে হলো বাজারে তথ্য গোপন, কৃত্রিম লেনদেন এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক কারসাজি এখনও ভয়াবহভাবে সক্রিয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবসময় শেষ মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হন। যারা কারসাজি করে তারা আগেই বেরিয়ে যায়, আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর আটকে থাকেন। শুধু কারখানা পরিদর্শন আর ডিএসই’র ওয়েবসেইটে উৎপাদন বন্ধের তথ্য প্রকাশ করলেই হবে না- যদি এখনই কঠোর নজরদারি ও উদাহরণমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে বাজারে আস্থা ফেরানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।’

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডমিনেজ স্টীলের মতো একটি দুর্বল, লোকসানি এবং কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানির শেয়ার কীভাবে দিনের পর দিন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে- এটা পুরো বাজারের জন্য ভয়ংকর বার্তা। এখানে স্পষ্টভাবেই একটি সংঘবদ্ধ কারসাজি চক্র সক্রিয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সামনে কৃত্রিমভাবে লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, অথচ বাস্তবে কোম্পানির কারখানাই বন্ধ। এটা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা।’

আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বহুবার বলেছি, বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে যারা দুর্বল কোম্পানি বেছে নিয়ে দাম বাড়ায়, তারপর সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা তুলে নেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ পুঁজিবাজার থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’

বিএসইসির এক সাবেক নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডমিনেজ স্টীলের মতো কোম্পানিগুলো বাজারে আসার সময় থেকেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু অতীতে নানা প্রভাব ও চাপের কারণে অনেক দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তির সুযোগ পেয়েছে। এখন তার ফল ভোগ করছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ রেখে সেই তথ্য গোপন করবে- এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ ধরনের ঘটনায় পরিচালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক তদন্ত, জরিমানা এমনকি ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। কিন্তু আমাদের বাজারে অনেক ক্ষেত্রেই দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে অসাধু গোষ্ঠীগুলো বারবার একই কৌশল ব্যবহার করার সাহস পাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের প্রতারণা কখনোই বন্ধ হবে না।’

আরও পড়ুন: ইউসিবি: মুনাফার আড়ালে ঘাটতি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা!

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করতে কমিশন সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো কোম্পানি যদি প্রচলিত সিকিউরিটিজ আইন, তালিকাভুক্তি বিধিমালা বা তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকে, তাহলে কমিশন প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন বা কারসাজির অভিযোগের বিষয়েও কমিশনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’

বিএসইসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সবসময় গুজব বা অপ্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি, আর্থিক সক্ষমতা ও প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কমিশন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।’ (চলবে…)

বিজনেস জার্নাল/এইচকে