সড়কে জন্মানো শিশুটি কেঁদে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে
- আপডেট: ০৬:২৯:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ জুলাই ২০২২
- / ১০৩৬৭ বার দেখা হয়েছে
বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: মায়ের জঠর থেকে পৃথিবীর আলো দেখার পর নবজাতকের জন্য বুকের দুধ মহৌষধ। কিন্তু সড়কে জন্ম নেওয়া শিশুর ভাগ্যে মায়ের বুকের দুধ জোটেনি। দুধের জন্য ক্ষণে ক্ষণে হাহাকার করে উঠছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে জন্ম নেওয়া সেই নবজাতক শিশু।
প্রাইভেট হাসপাতালের কেবিনে চিৎকার করে শিশুটি যখন কেঁদে উঠে তখন ড্রপার দিয়ে অন্য মায়ের বুকের দুধ মুখে তুলে দেয় কর্তব্যরত নার্স। কয়েক ড্রপ দুধ খেয়েই কান্না থামে শিশুটির। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অন্তত দুই সপ্তাহ লাগবে শিশুটি সুস্থ হতে।
অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুক–টুইটার–লিংকডইন–ইন্সটাগ্রাম–ইউটিউব
রোববার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড় এলাকায় লাবিব প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পরিচালকের কক্ষে বসা শিশুটির দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু। সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন অফিসার আসাদুজ্জামান ও কর্মী আবদুল্লাহ সুমন নানা তথ্য নিচ্ছেন শিশুটির দাদার কাছ থেকে। শিশুটির প্রয়োজনীয় সব সহায়তা সমাজসেবা বিভাগের পক্ষ থেকে করার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
শিশুটির চিকিৎসা চলছে হাসপাতালটির দ্বিতীয় তলার ২০৪ নম্বর কেবিনে। শিশুটির ডান হাত ভেঙে যাওয়ায় অর্থোপেডিকসের সার্জন ডা. সোহেল রানা ও কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। শিশুটির সার্বক্ষণিক দেখভাল করছেন সিনিয়র নার্স সুরাইয়া ইয়াসমিন ও নার্স শরিফা আক্তার।
শিশুটি যে কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছে রোববার দুপুর ১২টার দিকে সেখানে শোনা যায় শিশুটির কান্না। একটি বাটিতে পূর্ব থেকে সংরক্ষিত এক নারীর দুধ দ্রুত এগিয়ে দেন নার্স শরিফা আক্তার। মশারির নিচ থেকে নবজাতক শিশুটিকে কোলে নিয়ে ড্রপার দিয়ে খাওয়াতে থাকেন সিনিয়র নার্স সুরাইয়া ইয়াসমিন।
কয়েক ড্রপ দুধ খাওয়ানোর পরই অবশ্য আবার ঘুমিয়ে পড়ে শিশুটি। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অন্তত ৩ বার এমনটি করেছে বলে জানিয়েছেন নার্স সুরাইয়া ইয়াসমিন। বেসরকারি এই হাসপাতালটিতেই নগরীর দাপুনিয়া কানাপাড়া গ্রামের আলমাসের স্ত্রী নাছিমা বেগম ৫ দিন আগে সন্তান প্রসব করেন। তার বুকের দুধ দুর্ঘটনায় জন্ম নেওয়া শিশুটিকে দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালটির সিনিয়র নার্স সুরাইয়া ইয়াসমিন বলেন, শিশুটি খাবার ও পায়খানা করার সময় কান্নাকাটি করে। বাকি সময় খুবই শান্ত। অলৌকিকভাবে জন্ম হওয়া শিশুটির সেবা করতে পেরে তারও ভালো লাগছে।
লাবিব হাসপাতালের মালিক মো. শাহ জাহান জানান, শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ হতে ১৫ দিন লাগতে পারে। চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব ব্যয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বহন করছেন। অন্য মায়ের দুধ ফিডিং করানো হচ্ছে। অলটারনেটিভ দুধও রেডি রাখা হয়েছে। শিশুটির প্রয়োজন অনুযায়ী তা দেওয়া হচ্ছে। শিশুটিকে সুস্থ করে তোলার জন্য সব প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছি।
শিশুটির দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, আমি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় চা বিক্রি করে সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছি। তার ছেলে শ্বশুরবাড়িতে ঘর তুলে থাকতো। দুই ছেলেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ায় তাকেও দেখার আর কেউ রইল না। নবজাতক ও ছেলের রেখে যাওয়ার আরও দুটি সন্তান রয়েছে। শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠলে পরিবারের লোকজন মিলে দেখাশোনা করব।
গত শনিবার দুর্ঘটনার শিকার দম্পতি ও তার মেয়ে সন্তানকে যে স্থানে কবর দেওয়া হয়েছে সেখানে আগেও আরও চারটি কবর ছিলো। তার মধ্যে দু’জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের হয়েছিলেন। একটি পরিবারে বারবার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক বইছে।
২০০৪ সালে উপজেলার রায়মনি গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু ও সুফিয়া বেগম দম্পতির ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছেলে সামছুল আলম মিল থেকে ধান ভাঙিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে বাড়ির অদূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ট্রাকচাপায় প্রাণ হারিয়েছিল সে।
১৮ বছর পর ওই দম্পতির বড় ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, ছেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্না আক্তার ও ছয় বছরের নাতনি সানজিদা আক্তার ওই একই সড়কের ত্রিশাল পৌরশহরের কোর্ট ভবন নামক এলাকায় গত শনিবার দুপুরে ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান। প্রাণঘাতী ট্রাক একের পর এক প্রাণ কেঁড়ে নিলেও গর্ভবতী মায়ের পেট ফেঁটে বেরিয়ে আসে এক নবজাতক।
পৃথিবীর আলোর মুখ দেখতে পারলেও ওই নবজাতক শিশুটির মায়াভরা চোখ দুটি দেখতে পারেনি গর্ভধারিণী মা ও বাবার মুখখানা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে বেঁচে রইলো সে। অনাথ হয়ে গেল নিহত জাহাঙ্গীর আলম ও রত্না আক্তার দম্পতির নবজাতকসহ জান্নাত (৮) ও এবাদুল্লাহ (৫) নামে তিন শিশু। ১৯৯৫ সালেও বাবলুর ভাই ফজলুল হক একই মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় নিজ বাড়ির বসতঘরের পাশেই নিহত তিনজনের দাফন সম্পন্ন হয়। রোববার দুপুরে মোস্তাফিজুর রহমান বাবলুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে মাতম পরিবার, স্বজন-প্রতিবেশীদের আহাজারি। পাশাপাশি সাতটি কবরের ৫টিই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের শিকার।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ময়মনসিংহের সভাপতি আবদুল কাদির চৌধুরী মুন্না বলেন, সড়কে যতদিন শৃঙ্খরা না আসবে ততদিন এ ধরনের অবস্থার পরিত্রাণ হবে না। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং সাধারণ মানুষের সড়কে চলাচলে অজ্ঞতা দুটিই দায়ী।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, শিশুটির চিকিৎসাসহ সব দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। একটি ব্যাংক হিসাবও খোলে দেওয়া হবে যেখানে সহযোগিতা পাঠানো যাবে। এছাড়া পুরো পরিবারটির জন্য স্থায়ীভাবে কী করা যায় সে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রোববার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিহতের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলা কোর্ট ভবন নামক এলাকায় গত শনিবার দুপুরে ট্রাকচাপায় স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান নিহতের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। নিহতের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বাদী হয়ে রোববার বিকেলে ত্রিশাল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ট্রাকের অজ্ঞাতপরিচয় চালককে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাঈন উদ্দিন।
ঢাকা/এসএ






































