০৫:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৯ মে ২০২৬

পুঁজিবাজারে পি কে হালদারের যত আর্থিক কেলেঙ্কারি

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১২:২২:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মে ২০২২
  • / ১০৩৯৬ বার দেখা হয়েছে

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম শীর্ষ জালিয়াত ও লুটেরা প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার) ভারতের কলকাতায় গ্রেফতার হয়েছেন। দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে।

বহুল আলোচিত পিকে হালদার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, তারা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনেই কয়েক বছর ধরে এই লুটতরাজ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পিকে ও তার দোসরদের অর্থ লুটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন একজন ডেপুটি গভর্নর ও একজন নির্বাহী পরিচালকসহ কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা পিকে হালদারকে সুরক্ষা দিয়েছেন, তার লুটতরাজের সুবিধাভোগী হয়েছেন।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

পিকে হালদারের লুটতরাজের অন্যতম বড় শিকার দেশের পুঁজিবাজার। এই বাজারে তালিকাভুক্ত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ লুট করে সেগুলোকে অন্ত:সারশূন্য করে দিয়েছেন। কোম্পানিগুলো হচ্ছে-পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। তীব্র আর্থিক সংকটের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ পিপলস লিজিং অবসায়নের পথে আছে। এই প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম বন্ধ। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চালু আছে বটে। তবে উপরে এদের খোলসটা-ই আছে। ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁপা। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-কেউ এদের কাছে আমানত রাখতে রাজি নয়। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে যারা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত রেখেছেন, তাদের আমনত ফেরত পাচ্ছেন না।

কানাডা-ভারতসহ নানা স্থানে পালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি এই জালিয়াতের। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধে তাকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। পশ্চিমবঙ্গে পৃথক ৯টি স্থানে একযোগে অভিযান চালিয়ে শনিবার পি কে হালদার ছাড়াও তার অপকর্মের অন্যতম সহযোগী ছোট ছাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও প্রাণেশ কুমার হালদারকে আটক করা হয়।

আর্থিক জালিয়াতি সংঘটনে ‘বহুমুখী প্রতিভার’ পরিচয় দিয়েছেন পি কে হালদার। নানা কৌশলে নামে-বেনামে একের পর এক কোম্পানি খুলে, প্রভাব খাটিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধসিয়ে দিয়েছেন তিনি।

ঋণের নামে টাকা লোপাট, নামে-বেনামে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনার অভিযোগ রয়েছে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদারের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে নিজের আত্মীয়, বন্ধু, সাবেক সহকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে পর্ষদে বসিয়ে অন্তত চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন।

এই চার কোম্পানি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (আইএলএফএসএল), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ।

অস্তিত্বহীন ৩০-৪০টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণের নামে জালিয়াতি করে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সরিয়েছেন পি কে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ও পিপলস লিজিং থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে মর্টগেজ (জামানত) নেই বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে।

নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই কাগুজে। এর মধ্যে রয়েছে পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ট্রাভেল, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল, হাল টেকনোলজি, সুখাদা লিমিটেড, আনন কেমিক্যাল, নর্দার্ন জুট, রেপটাইল ফার্মসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন পি কে হালদারের আত্মীয়রা। তার মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও আছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়।

২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় প্রথম পি কে হালদারের নাম সামনে আসে। এ সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, পি কে হালদার তাদের একজন।

দুদক ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পি কে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

অবৈধ সম্পদের অবস্থান গোপন করতে ১৭৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন পি কে হালদার। তিনি এসব অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা রাখেন। পাশাপাশি এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে ও বেনামে আরও ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। দুদকের তথ্য বলছে, পি কে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন পি কে হালদার। কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রণে নিতে ২০১৫ সালে বিভিন্ন নামে শেয়ার কেনেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে হাল ইন্টারন্যাশনাল, বিআর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ ও নিউ টেক এন্টারপ্রাইজ। হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পি কে হালদার নিজে। এভাবে প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা।

বিআইএফসিতে আমানত রাখা গ্রাহকরা এখনও আমানত ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। সুকুজা ভেঞ্চারের শেয়ার সুখাদা লিমিটেড ও সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার হাতে। এর মধ্যে অনিন্দিতা মৃধার শেয়ারই ৯০ শতাংশ। কাঞ্চি ভেঞ্চারের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হাল ইন্টারন্যাশনালের হাতে রাখা হয়।

প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় পিপলস লিজিং থেকে। এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছিল আনন কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আবার আনন কেমিক্যালের ৯৪ শতাংশ শেয়ার প্রীতিশ কুমার হালদারের হাতে ও ৫ শতাংশ শেয়ার রাখা হয় তার খালাতো ভাই অভিজিৎ অধিকারীর হাতে। পিপলস লিজিংয়ের আমানত ফেরত দিতে না পারায় অবসায়ন ঘোষণা করা হয়।

এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিতে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্মের নামে প্রতিষ্ঠান খোলেন পি কে হালদার। মালিক মূলত পি কে হালদারই।

কে এই পি কে হালদার

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দীঘিরজান গ্রামে পি কে হালদারের জন্ম। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তার মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে পি কে হালদার বড়। ছোট ভাইয়ের নাম প্রীতিশ কুমার হালদার। দুই ভাই-ই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।

পি কে হালদার ২০০৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে এমডি পদে যোগ দেন।

ঢাকা/এসএ

শেয়ার করুন

পুঁজিবাজারে পি কে হালদারের যত আর্থিক কেলেঙ্কারি

আপডেট: ১২:২২:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মে ২০২২

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম শীর্ষ জালিয়াত ও লুটেরা প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার) ভারতের কলকাতায় গ্রেফতার হয়েছেন। দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে।

বহুল আলোচিত পিকে হালদার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, তারা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনেই কয়েক বছর ধরে এই লুটতরাজ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পিকে ও তার দোসরদের অর্থ লুটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন একজন ডেপুটি গভর্নর ও একজন নির্বাহী পরিচালকসহ কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা পিকে হালদারকে সুরক্ষা দিয়েছেন, তার লুটতরাজের সুবিধাভোগী হয়েছেন।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

পিকে হালদারের লুটতরাজের অন্যতম বড় শিকার দেশের পুঁজিবাজার। এই বাজারে তালিকাভুক্ত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ লুট করে সেগুলোকে অন্ত:সারশূন্য করে দিয়েছেন। কোম্পানিগুলো হচ্ছে-পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। তীব্র আর্থিক সংকটের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ পিপলস লিজিং অবসায়নের পথে আছে। এই প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম বন্ধ। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চালু আছে বটে। তবে উপরে এদের খোলসটা-ই আছে। ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁপা। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-কেউ এদের কাছে আমানত রাখতে রাজি নয়। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে যারা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত রেখেছেন, তাদের আমনত ফেরত পাচ্ছেন না।

কানাডা-ভারতসহ নানা স্থানে পালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি এই জালিয়াতের। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধে তাকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। পশ্চিমবঙ্গে পৃথক ৯টি স্থানে একযোগে অভিযান চালিয়ে শনিবার পি কে হালদার ছাড়াও তার অপকর্মের অন্যতম সহযোগী ছোট ছাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও প্রাণেশ কুমার হালদারকে আটক করা হয়।

আর্থিক জালিয়াতি সংঘটনে ‘বহুমুখী প্রতিভার’ পরিচয় দিয়েছেন পি কে হালদার। নানা কৌশলে নামে-বেনামে একের পর এক কোম্পানি খুলে, প্রভাব খাটিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধসিয়ে দিয়েছেন তিনি।

ঋণের নামে টাকা লোপাট, নামে-বেনামে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনার অভিযোগ রয়েছে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদারের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে নিজের আত্মীয়, বন্ধু, সাবেক সহকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে পর্ষদে বসিয়ে অন্তত চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন।

এই চার কোম্পানি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (আইএলএফএসএল), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ।

অস্তিত্বহীন ৩০-৪০টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণের নামে জালিয়াতি করে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সরিয়েছেন পি কে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ও পিপলস লিজিং থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে মর্টগেজ (জামানত) নেই বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে।

নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই কাগুজে। এর মধ্যে রয়েছে পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ট্রাভেল, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল, হাল টেকনোলজি, সুখাদা লিমিটেড, আনন কেমিক্যাল, নর্দার্ন জুট, রেপটাইল ফার্মসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন পি কে হালদারের আত্মীয়রা। তার মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও আছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়।

২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় প্রথম পি কে হালদারের নাম সামনে আসে। এ সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, পি কে হালদার তাদের একজন।

দুদক ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পি কে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

অবৈধ সম্পদের অবস্থান গোপন করতে ১৭৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন পি কে হালদার। তিনি এসব অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা রাখেন। পাশাপাশি এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে ও বেনামে আরও ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। দুদকের তথ্য বলছে, পি কে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন পি কে হালদার। কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রণে নিতে ২০১৫ সালে বিভিন্ন নামে শেয়ার কেনেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে হাল ইন্টারন্যাশনাল, বিআর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ ও নিউ টেক এন্টারপ্রাইজ। হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পি কে হালদার নিজে। এভাবে প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা।

বিআইএফসিতে আমানত রাখা গ্রাহকরা এখনও আমানত ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। সুকুজা ভেঞ্চারের শেয়ার সুখাদা লিমিটেড ও সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার হাতে। এর মধ্যে অনিন্দিতা মৃধার শেয়ারই ৯০ শতাংশ। কাঞ্চি ভেঞ্চারের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হাল ইন্টারন্যাশনালের হাতে রাখা হয়।

প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় পিপলস লিজিং থেকে। এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছিল আনন কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আবার আনন কেমিক্যালের ৯৪ শতাংশ শেয়ার প্রীতিশ কুমার হালদারের হাতে ও ৫ শতাংশ শেয়ার রাখা হয় তার খালাতো ভাই অভিজিৎ অধিকারীর হাতে। পিপলস লিজিংয়ের আমানত ফেরত দিতে না পারায় অবসায়ন ঘোষণা করা হয়।

এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিতে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্মের নামে প্রতিষ্ঠান খোলেন পি কে হালদার। মালিক মূলত পি কে হালদারই।

কে এই পি কে হালদার

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দীঘিরজান গ্রামে পি কে হালদারের জন্ম। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তার মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে পি কে হালদার বড়। ছোট ভাইয়ের নাম প্রীতিশ কুমার হালদার। দুই ভাই-ই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।

পি কে হালদার ২০০৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে এমডি পদে যোগ দেন।

ঢাকা/এসএ