রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ইতিহাসের সর্বোচ্চ আমদানি ব্যয়
- আপডেট: ০১:১০:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ জুলাই ২০২২
- / ১০৩০৬ বার দেখা হয়েছে
বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: পণ্য আমদানি কমলেও গেল অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়ে রেকর্ড হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিফলন হয়েছে আমদানি ব্যয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমদানি ব্যয় কখনো এত বেশি হয়নি।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো গেল অর্থবছরে পুরোটা সময় ধরে বৈশ্বিক বাজারে পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার দিকে যাওয়ায় দেশে দেশে চাহিদা কমছে। আবার অনেক পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে। তাতে গত মে-জুন মাস থেকে বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। জাহাজভাড়াও কমেছে। এতে ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় কিছুটা কমতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুক–টুইটার–লিংকডইন–ইন্সটাগ্রাম–ইউটিউব
রেকর্ড আমদানি ব্যয়: চট্টগ্রাম, মোংলাসহ ২৯টি কাস্টমস ও শুল্ক স্টেশনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২০২১–২২ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৮৭ কোটি ডলার। তার আগের অর্থবছরের এসব স্টেশনে দিয়ে পণ্য আমদানি ব্যয় ছিল ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পণ্য আমদানিতে ব্যয় ৩৩ শতাংশ বা ২ হাজার ২৩২ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় হয়েছে। এসব শুল্ক স্টেশন দিয়ে ৯৮ শতাংশ পণ্য আমদানি হয়।
আমদানি ব্যয় বাড়লেও পরিমাণের দিক থেকে সার্বিকভাবে আমদানি কমেছে। রাজস্ব বোর্ডের প্রাথমিক হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছে ১৩ কোটি ৯৪ লাখ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৫০ লাখ। অর্থাৎ পণ্য আমদানি ৫৬ লাখ টন বা ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ কমেছে।
পরিমাণ ও আমদানি ব্যয়ের তুলনা করে দেখা গেছে, কোনো কোনো পণ্যের আমদানি কমলেও ব্যয় বেড়েছে। আবার অনেক পণ্যে আমদানি যেমন বেড়েছে তেমনি পাল্লা দিয়ে ব্যয়ও বেড়েছে। যেমন সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকারের আমদানি কমলেও ব্যয় বেড়েছে। একই অবস্থা গম, সয়াবিন বীজ, অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও। আবার পুরোনো লোহার টুকরো, তুলা, এলপিজি, সার, পাম তেলের মতো পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ব্যয়ও বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে দাম কমায় চাপ কমবে: বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দাম কমতে শুরু করেছে। দাম কমার এই তালিকায় আছে সয়াবিন তেল, পাম তেল, সয়াবিন বীজ, গমের মতো ভোগ্যপণ্য। আবার শিল্পের কাঁচামাল তুলা, পুরোনো লোহার টুকরো ও সারের দাম কমেছে।
দাম কমার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয়ও কমবে। যেমন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে গত অর্থবছরে ১১২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় এই ব্যয় ৩৯ কোটি ৬৯ লাখ ডলার বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য লেনদেনের বাজার শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডের (সিবিওটি) হিসাবে, গত আড়াই মাসের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম কমেছে ৩২ শতাংশ। গমের দাম কমেছে ২৫ শতাংশ। মালয়েশিয়ার বুশরা ডেরিভেটিভসের হিসাবে, আড়াই মাসের ব্যবধানে অপরিশোধিত পাম তেলের দাম কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
ভোগ্যপণ্যের মতো শিল্পের কাঁচামালের দামও কমছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রড তৈরির কাঁচামাল গলনশীল ভারী লোহার টুকরোর দাম টনপ্রতি বেড়ে ৬০০ ডলার ছাড়িয়েছিল। এখনো এর দর ৫০০ ডলারের নিচে রয়েছে। একইভাবে কমেছে তুলার দামও। এলপিজির দামও কিছুটা সংশোধন হয়েছে। কয়লার দাম না কমায় সিমেন্টের কাঁচামালের দাম কমেনি। টনপ্রতি ১-২ ডলার সংশোধিত হয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম সংশোধন হচ্ছে। এটা ইতিবাচক দিক। তবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি পণ্যের দাম সেভাবে সংশোধন হয়নি। জ্বালানির দামে বড় ধরনের সংশোধন হলে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় যেতে পারব আমরা। কারণ, জ্বালানি পণ্যের দাম ঘিরে সবকিছুর দাম ওঠানামা করে।’
২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলার। একই সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধ পথে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। আমদানি-রপ্তানি ও প্রবাসী আয় মিলে দেশে গত অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলার।
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমতে থাকায় বছরের শেষ দিক নভেম্বর থেকে আমদানি ব্যয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকারের ভর্তুকিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটা ঠিক, পণ্যমূল্যের দাম সংকটের আগের অবস্থায় যেতে সময় লাগবে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ পুরোপুরি যাবে না। আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার বিলাসপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি, ঋণপত্রের মার্জিন বাড়ানোর মতো যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে বছর শেষে কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় যেতে পারব আমরা।’
ঢাকা/এসএ




































