০১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

নাম বদলে কালো টাকা হচ্ছে ‘মূলধনি আয়’

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১১:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
  • / ১০১৭৩ বার দেখা হয়েছে

আগামী অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আছে কি নেই—এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, বিশ্লেষণ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, আগামী বছরও এ সুযোগ থাকছে, তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে নেই। এ বিতর্কের মধ্যেই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয়ের নতুন নাম দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ কর্তারা। তারা বলেছেন, বাজেটে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাকে কালো টাকা বলা যাবে না। সেটা হলো ক্যাপিটাল গেইন বা মূলধনি আয়। তবে এনবিআরের এই নামকরণকে অযৌক্তিক বলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, অপ্রদর্শিত আয় মূলধনি আয় হতে পারে না। মূলধনি আয় ভিন্ন বিষয়।

চলতি বাজেটের মতো আগামী জাতীয় বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। তবে বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও জমি ও ফ্ল্যাট কেনায় ভিন্নভাবে এ সুযোগ রাখা হয়েছে। মূলত জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ বেশি দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মৌজা রেট বা নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত দামের বড় ধরনের বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এই নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই অনেক টাকা অপ্রদর্শিত বা ‘কালো’ হয়ে যায়। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ এবার যেন জাতীয় বাজেটে না থাকে, সেই দাবি বিভিন্ন মহল থেকে আগেই জানানো হয়েছিল।

আগামী অর্থবছরও জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত বা বাজারমূল্যের যে অংশটুকু দেখানো হয় না, সে অংশের টাকা করদাতা তার রিটার্নে উল্লেখ করতে পারবে এবং নির্ধারিত হারে কর দিয়ে তার অপ্রদর্শিত অর্থকে আয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নে তাকে ঘোষণা দিতে হবে যে, এ টাকা সে জমি বিক্রি করে আয় করেছে এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে তার এ আয় বৈধ হয়ে যাবে।

তবে এটিকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় কোনোটাই বলতে রাজি নন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান। অপ্রদর্শিত এই আয়ের নাম কী হবে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা মূলত ক্যাপিটাল গেইন। ব্যক্তি তার মূলধনি সম্পদ বিক্রি করে এই আয় করেছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরুন আপনার একটি জমি বিক্রি করেছেন ১০ লাখ টাকায়। কিন্তু এটার মৌজা মূল্য ২ লাখ টাকায় জমি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। তাহলে বাকি ৮ লাখ টাকা ওই অর্থবছরেই আয়কর রিটার্নে দেখাতে পারবেন। রিটার্নে দেখানোর সময় আপনাকে বলতে হবে যে, এই অর্থ আপনার জমি বিক্রি থেকে আয় করেছেন। নির্ধারিত হারে কর দিলে এ আয় বৈধ হয়ে যাবে। এ সুযোগ চলতি বাজেটেও রয়েছে।

আর্থিক বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, ক্যাপিটাল গেইন হলো মূলধনি মুনাফা, যা কোনো সম্পদ (যেমন: জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার বা স্বর্ণ) কেনার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে অর্জিত লাভ। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি একটি সম্পদ ১০ লাখ টাকায় কিনে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে তার ক্যাপিটাল গেইন হবে ২ লাখ টাকা। এই লাভের ওপর সরকার যে কর ধার্য করে, তাকে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স বলা হয়। তবে এ অপ্রদর্শিত আয়কে কোনোভাবেই ক্যাপিটাল গেইন বলা যায় না বলে অভিমত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের। তিনি বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যান কী বলেছে সেই তর্কে আমি যাচ্ছি না। তবে এটাকে আমি কোনোভাবে ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে দেখছি না। আমি যেটা দেখেছি, প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এটা জমি ক্রয়-বিক্রয়ের যে অপ্রদর্শিত আয়, সেটা বৈধ করার সুযোগ এবারও রাখা হয়েছে।

এ ধরনের সুযোগ বারবার দেওয়া হলেও সরকারের রাজস্ব আয় খুব একটা বাড়ে না, বরং এটি সৎ করদাতাদের জন্য একটি ‘মরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করেন তিনি।মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, মৌজা রেটের নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই অনেক টাকা অপ্রদর্শিত বা ‘কালো’ হয়ে যায়। সরকার মৌজা রেট হালনাগাদ করার কথা বলছে; হয়তো নীতিমালার পরিবর্তনের আগে এটিই হবে ‘শেষ’ সুযোগ।

ঢাকা/আরএইচ

শেয়ার করুন

নাম বদলে কালো টাকা হচ্ছে ‘মূলধনি আয়’

আপডেট: ১১:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

আগামী অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আছে কি নেই—এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, বিশ্লেষণ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, আগামী বছরও এ সুযোগ থাকছে, তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে নেই। এ বিতর্কের মধ্যেই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয়ের নতুন নাম দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ কর্তারা। তারা বলেছেন, বাজেটে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাকে কালো টাকা বলা যাবে না। সেটা হলো ক্যাপিটাল গেইন বা মূলধনি আয়। তবে এনবিআরের এই নামকরণকে অযৌক্তিক বলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, অপ্রদর্শিত আয় মূলধনি আয় হতে পারে না। মূলধনি আয় ভিন্ন বিষয়।

চলতি বাজেটের মতো আগামী জাতীয় বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। তবে বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও জমি ও ফ্ল্যাট কেনায় ভিন্নভাবে এ সুযোগ রাখা হয়েছে। মূলত জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ বেশি দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মৌজা রেট বা নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত দামের বড় ধরনের বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এই নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই অনেক টাকা অপ্রদর্শিত বা ‘কালো’ হয়ে যায়। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ এবার যেন জাতীয় বাজেটে না থাকে, সেই দাবি বিভিন্ন মহল থেকে আগেই জানানো হয়েছিল।

আগামী অর্থবছরও জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত বা বাজারমূল্যের যে অংশটুকু দেখানো হয় না, সে অংশের টাকা করদাতা তার রিটার্নে উল্লেখ করতে পারবে এবং নির্ধারিত হারে কর দিয়ে তার অপ্রদর্শিত অর্থকে আয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নে তাকে ঘোষণা দিতে হবে যে, এ টাকা সে জমি বিক্রি করে আয় করেছে এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে তার এ আয় বৈধ হয়ে যাবে।

তবে এটিকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় কোনোটাই বলতে রাজি নন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান। অপ্রদর্শিত এই আয়ের নাম কী হবে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা মূলত ক্যাপিটাল গেইন। ব্যক্তি তার মূলধনি সম্পদ বিক্রি করে এই আয় করেছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরুন আপনার একটি জমি বিক্রি করেছেন ১০ লাখ টাকায়। কিন্তু এটার মৌজা মূল্য ২ লাখ টাকায় জমি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। তাহলে বাকি ৮ লাখ টাকা ওই অর্থবছরেই আয়কর রিটার্নে দেখাতে পারবেন। রিটার্নে দেখানোর সময় আপনাকে বলতে হবে যে, এই অর্থ আপনার জমি বিক্রি থেকে আয় করেছেন। নির্ধারিত হারে কর দিলে এ আয় বৈধ হয়ে যাবে। এ সুযোগ চলতি বাজেটেও রয়েছে।

আর্থিক বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, ক্যাপিটাল গেইন হলো মূলধনি মুনাফা, যা কোনো সম্পদ (যেমন: জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার বা স্বর্ণ) কেনার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে অর্জিত লাভ। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি একটি সম্পদ ১০ লাখ টাকায় কিনে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে তার ক্যাপিটাল গেইন হবে ২ লাখ টাকা। এই লাভের ওপর সরকার যে কর ধার্য করে, তাকে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স বলা হয়। তবে এ অপ্রদর্শিত আয়কে কোনোভাবেই ক্যাপিটাল গেইন বলা যায় না বলে অভিমত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের। তিনি বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যান কী বলেছে সেই তর্কে আমি যাচ্ছি না। তবে এটাকে আমি কোনোভাবে ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে দেখছি না। আমি যেটা দেখেছি, প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এটা জমি ক্রয়-বিক্রয়ের যে অপ্রদর্শিত আয়, সেটা বৈধ করার সুযোগ এবারও রাখা হয়েছে।

এ ধরনের সুযোগ বারবার দেওয়া হলেও সরকারের রাজস্ব আয় খুব একটা বাড়ে না, বরং এটি সৎ করদাতাদের জন্য একটি ‘মরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করেন তিনি।মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, মৌজা রেটের নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই অনেক টাকা অপ্রদর্শিত বা ‘কালো’ হয়ে যায়। সরকার মৌজা রেট হালনাগাদ করার কথা বলছে; হয়তো নীতিমালার পরিবর্তনের আগে এটিই হবে ‘শেষ’ সুযোগ।

ঢাকা/আরএইচ