প্রযুক্তিতে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির দ্বার উন্মোচন
- আপডেট: ০২:০৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
- / ১০১৭৩ বার দেখা হয়েছে
একুশ শতকের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর খাত বা চিপ। মোবাইল, কম্পিউটার থেকে শুরু করে প্রযুক্তি নির্ভরশীল বিশ্বে চিপ এখন কৌশলগত পণ্য। সেই দৌড়ে পা রাখতে যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রযক্তিনির্ভর চিপ তৈরি এ খাতকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে সব ধরনের কর সুবিধা দিয়েছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের এই বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার পথ সুগম করেছে সরকার। সরকারি এই নীতি সহায়তায় পুরোপুরি রপ্তানিমুখী সেমিকন্ডাক্টর খাতের ৬ মিলিয়ন ডলারে থাকা রপ্তানি আয় আগামী ৫ বছরে বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের পর প্রযুক্তি খাত হতে পারে আরেকটি বড় রপ্তানিমুখী শিল্প।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য আমদানিকৃত উপকরণের ওপর ১ শতাংশের ওপরে কোনো আমদানি শুল্ক, সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আগাম কর সুবিধা স্থগিত রাখা হবে। এরপরই এই সুবিধাগুলো বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সরকারের এই প্রণোদনা প্যাকেজটি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন-ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ডিজাইন, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ), সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলিং ও টেস্টিং (ওএসএটি) এবং প্যাকেজিং ও ফেব্রিকেশন সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে।
ইলেকট্রনিক যন্ত্রের অত্যাবশ্যকীয় ক্ষুদ্রাংশ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের শীর্ষে অবস্থানে রয়েছে তাইওয়ান। এ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের ওপরে আছে তাদের নাম। তবে বাজেটে প্রযুক্তি খাতের বড় সুখবর হচ্ছে, সেই তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম। বিদেশি বিনিয়োগ আর্কষণ এবং কর্মসংস্থান ও দেশীয় শিল্পের বিকাশে সরকারের এ উদ্যোগ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলেও অভিমত সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এখনো এ খাতে তেমন উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে চিপ ডিজাইন করে বছরে প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলার আয় করছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক পর্যায়ে চিপ ডিজাইন ও টেস্টিং খাতে মনোনিবেশ করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ আয় এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের ইলেট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাদিম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট উন্নয়ন, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন, আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্টিং, প্যাকেজিং এবং ফ্যাব্রিকেশন খাতের জন্য ব্যাপক কর ও শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে। সরকারের এই নীতিগত সহায়তা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন, ডেটা সেন্টার, অটোমোবাইল, টেলিযোগাযোগ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর চিপ অপরিহার্য। ফলে এই শিল্পে অংশগ্রহণ মানে কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; বরং উচ্চমূল্যের রপ্তানি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার, পরীক্ষণ সরঞ্জাম এবং উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি কার্যত ১ শতাংশে সীমিত করা হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নাদিম চৌধুরী বলেন, সরকারের এই সুবিধার মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইডিএ সফটওয়্যার যেমন ক্যাডেন্স, সিমেন্সের মতো ডিজাইন টুলসকে এ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। এতে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের চিপ ডিজাইন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এ ছাড়া ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, হার্ডওয়্যার এমুলেশন সিস্টেম, হাইস্পিড অসিলোস্কোপ, ভেক্টর নেটওয়ার্ক অ্যানালাইজার, অটোমেটেডটেস্ট ইকুইপমেন্ট এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক পরীক্ষণ সরঞ্জাম আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলেও জানান বুয়েটের এই শিক্ষক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেমিকন্ডাক্টর খাতের এই প্রণোদনা দেশের জন্য কৌশলগত কয়েকটি সুফল বয়ে আনতে পারে। প্রথমত, বাংলাদেশে ফ্যাবলেস চিপ ডিজাইন কোম্পানি গড়ে ওঠার পথ সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে গবেষণা ও ডিজাইন সেন্টার স্থাপনে আগ্রহী হবে। তৃতীয়ত, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রকৌশলী ও গবেষকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং, টেস্টিং এবং উৎপাদনভিত্তিক শিল্প বিকাশের ভিত্তি তৈরি হবে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উদীয়মান প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সঠিক বাস্তবায়ন, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং শিল্প একাডেমি সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এটি বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের পথে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ম্যাককিন্সির মতে, গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২১ শতকের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পৌঁছাবে। এরই মধ্যে খাতটি ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারে ২০২১ সালে ৬০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তৈরি পোশাক শিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় রপ্তানি খাত। সরকারের এই রেয়াতি সুবিধা মাইলফলক হয়ে থাকবে।
জানা গেছে, দেশের ক্ষুদ্র পরিসরের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পটি এরই মধ্যে বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানে উল্কাসেমি প্রায় ৩০০ প্রকৌশলী নিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন করছে। তারা গুগল, অ্যাপল, ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন করছে। আপাতত ডিজাইন পর্যায়ের কাজ করলেও লক্ষ্য উৎপাদনে যাওয়া। এ ছাড়া নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, প্রাইম সিলিকন, টোটন ইলেকট্রনিকসের মতো কোম্পানি কাজ করছে। এ ছাড়া দেশীয় বড় কোম্পানিগুলো এই বাজারে প্রবেশ করার কাজ শুরু করেছে। ঘরের বাতি, টিভি, ফ্রিজ, ওভেন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ব্যবহারের মোবাইল হ্যান্ডসেট—যেখানে যা, তার সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর।
ঢাকা/আরএইচ


































