দেশে প্রথমবার দুই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ার উদ্যোগ, নীতিগত অনুমোদন
- আপডেট: ০২:২৮:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
- / ১০১৭৫ বার দেখা হয়েছে
দেশে প্রথমবারের মতো দুটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দরের কাছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় এ দুটি অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।বুধবার (১৭ জুন) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানান, দেশের অর্থনীতিতে গতি আনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্যেই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে দুটি স্থানে মোট প্রায় ৬০০ একর জমিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মাতারবাড়ি এলাকায় প্রায় ৩০০ একর জমিতে একটি অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অপরটি চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় স্থাপন করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, বর্তমানে বিষয়টি ধারণাগত (কনসেপ্ট) পর্যায়ে রয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং নীতিগতভাবে ইতিবাচক মত দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হবে।তিনি বলেন, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কাস্টমস ও কর-সংক্রান্ত অনেক বিধিনিষেধ শিথিল বা অনুপস্থিত থাকে। এতে বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সহজে বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, বিদেশ থেকে আসা জাহাজগুলো এসব অঞ্চলে পণ্য খালাস, বিক্রি বা পুনঃরপ্তানির সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারাও এখান থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সহজে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন।কী সুবিধা পাবে বাংলাদেশমন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির মতে, এ ধরনের অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, ভলিউম অব ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি বাড়বে, জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, বন্দরের ব্যবহার বাড়বে, জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি পাবে এবং পণ্য ও সেবার দ্রুত স্থানান্তর সম্ভব হবে।তিনি জানান, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবা সহজলভ্য হবে এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দামও কমতে পারে।
নাসিমুল গনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাইয়ের উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুবাইয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে সেখানে বিপুল বিনিয়োগ এসেছে এবং সেটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও সেই ধরনের একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।বাংলাদেশি ও বিদেশি সবার জন্য উন্মুক্ত
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে বাংলাদেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগ করতে পারবেন। এখানে উৎপাদনমুখী শিল্প, গুদামজাতকরণ, লজিস্টিকস, বাণিজ্যিক সেবা, এমনকি পর্যটনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমও গড়ে উঠতে পারে।তবে কী ধরনের শিল্প বা ব্যবসা সেখানে অগ্রাধিকার পাবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল বৈঠকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) স্থাপনের জন্য বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক কোম্পানি গঠন এবং সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন ও ভূমি ইজারা চুক্তির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিজেদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের কাছাকাছি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সে কারণে একটি সমন্বিত চীনা শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা আরও সহজ হবে।তবে বিনিয়োগের পরিমাণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে জানান তিনি।
কেন এখন এই উদ্যোগ
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এটি কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ হঠাৎ করে নেওয়া হয় না। এটি একটি সাসটেইনড বা ধারাবাহিক অর্থনৈতিক কর্মসূচির অংশ।
তিনি আরও বলেন, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামনে বিস্তারিত পরিকল্পনা
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, বর্তমানে মূলত জমি বরাদ্দ ও নীতিগত অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে উদ্যোগগুলো। পরবর্তী ধাপে সম্ভাব্যতা যাচাই, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা, বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণ এবং অবকাঠামোগত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করা হবে।তিনি বলেন, বাংলাদেশের এ ধরনের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল পরিচালনার সরাসরি অভিজ্ঞতা নেই। তাই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে সবচেয়ে কার্যকর মডেল বেছে নেওয়া হবে।
এদিকে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপন সংক্রান্ত কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সুপারিশের একটি অংশ নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-সহ ১০টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত এ কমিটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করে।
কমিটির সুপারিশের আলোকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে আনোয়ারা এলাকায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে বেজার গভর্নিং বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মালিকানাধীন যে পরিমাণ জমি গ্রহণ করা হবে, তার সমপরিমাণ জমি অন্যত্র বিপিডিবিকে দেবে বেজা।এ প্রেক্ষাপটে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপন সংক্রান্ত বেজা গভর্নিং বোর্ডের সিদ্ধান্তের নীতিগত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি তা অনুমোদন দিয়েছে।
ঢাকা/আরএইচ


































