আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে: অর্থমন্ত্রী
- আপডেট: ০২:০২:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
- / ১০২০৭ বার দেখা হয়েছে
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাবে দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন খাতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী খন্দকার আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিকে বাঁচাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে প্রায় অকার্যকর অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা এখন একটি ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে দেশ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করছে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করবে তার ওপর।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘ফাইনান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং সামিট ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
দেশে করপোরেট সুশাসন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল বাংলাদেশ, দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ এবং দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে এ সামিট আয়োজন করা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক প্রতিবেদন, অডিট ও কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের অডিটিং ও রিপোর্টিং ইকোসিস্টেম প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে অর্থপাচার, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঋণ নেওয়া এবং পুঁজিবাজারে ভুয়া কোম্পানির তালিকাভুক্তির মতো ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি ফলস রিপ্রেজেন্টেশন করে স্টক মার্কেটে এসেছে, তারাই অনেক ক্ষেত্রে বড় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এতে ভালো ও স্বচ্ছ কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি রয়েছে। অনেক সফল কোম্পানি এবং একাধিক ব্যাংকও গুরুতর ক্যাপিটাল ডেফিসিটে ভুগছে। এর পেছনে খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দায়ী।
ব্যাংক মালিকানার ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত মালিক শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীরা। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংকের মালিক দাবি করে বোর্ডে বসে নিজেরাই ঋণ অনুমোদন করবে—এটা সঠিক নয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে স্বার্থের সংঘাত কঠোরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান সরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। এজন্য আইসিএবি ও আইসিএমএবির সদস্যদের নিজেদের পেশাগত জায়গা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, এফআরসি শুধু ওভারসাইট করতে পারে। কিন্তু সঠিক রিপোর্টিং ও অডিটের দায়িত্ব শুরু হতে হবে আপনাদের ভেতর থেকেই।
নিজের বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ের একটি উদাহরণ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিজিএমইএকে ইউডি সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে সরকার বড় ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু তারা সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছে। একইভাবে পেশাজীবী সংগঠনগুলোকেও নিজেদের সদস্যদের কার্যক্রম তদারকি করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বড় বড় আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগ্যানসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসতে চায়।
তিনি বলেন, প্রতিদিনই আমি আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের সঙ্গে বৈঠক করছি। তারা বাংলাদেশকে নিয়ে বিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠনের কথা বলছে।
অর্থমন্ত্রী অডিটরদের সতর্ক করে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে কোম্পানির ব্যালেন্স শিট, অডিট রিপোর্ট ও আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করতে হবে। সরকার পুঁজিবাজার, আর্থিক খাত ও এনবিআরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ডিরেগুলেশনের পরিকল্পনা করছে। তবে সেটি সফল করতে পেশাজীবীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ডিরেগুলেশন করলাম, কিন্তু রিপোর্টিং ঠিক না থাকলে কোনো লাভ হবে না। দেশের অর্থনীতি বাস্তব অর্থে বড় হলে সবাই লাভবান হবে। তাই আমাদের সবাইকে মিলেই গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে কাজ করতে হবে।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসি চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া। এতে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু প্রমুখ।
ঢাকা/এসএইচ



































