১২:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিলে গুনতে হবে বাড়তি কর

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১০:৫১:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • / ১০১৭২ বার দেখা হয়েছে

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ বিতরণে উৎসাহিত করতে নতুন কর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার। আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরে কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ওই ঘাটতির ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপের বিধান রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করা হলে অথবা শুধু স্টক লভ্যাংশ দিলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর আইনের সংশোধনী প্রস্তাবে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করতে পারেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ নতুন কর ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকবে। আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার বিধানটি কার্যকর হলে তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ নিয়মের ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা জমা রেখে কম নগদ লভ্যাংশ দিচ্ছে, তাদের ওপর শেয়ারহোল্ডারবান্ধব নীতি গ্রহণের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে অতিরিক্ত স্টক লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরে কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি কর-পরবর্তী নিট আয়ের ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করে, তাহলে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশের নির্ধারিত সীমা এবং প্রকৃত বিতরণ করা লভ্যাংশের মধ্যে যে পার্থক্য থাকবে, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে এ কর পরিশোধ না করলে উপকর কমিশনার নোটিশ দিয়ে শুনানির সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে কর নির্ধারণ করতে পারবেন।উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১০০ কোটি টাকা হলে অন্তত ৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে হবে। যদি কোম্পানিটি ২০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেয়, তাহলে বাকি ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি পূর্ববর্তী বছরের কর-পরিশোধিত নিট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি সংরক্ষিত আয়, তহবিল, সঞ্চিতি বা উদ্বৃত্তে স্থানান্তর করলে স্থানান্তরিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে করারোপ করা হতো। অর্থাৎ কর আরোপের ভিত্তি ছিল মুনাফা সংরক্ষণের পরিমাণ। নতুন ব্যবস্থায় সেই ভিত্তি পরিবর্তন করে সরাসরি লভ্যাংশ বিতরণের হারের সঙ্গে করকে যুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে, স্টক লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও আগামী অর্থবছরে কিছুটা পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ক্ষেত্রে নগদ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা বা শুধু স্টক লভ্যাংশ বিতরণ করলে স্টক লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে এ করের আওতার বাইরে রাখা হবে। তবে অন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ১০ শতাংশ কর বহাল থাকবে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কোম্পানিকে নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ দিতে বাধ্য করা আদর্শ নাও হতে পারে। সাধারণত একটি কোম্পানি কত লভ্যাংশ দেবে, সেটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্তের বিষয়। বিশেষ করে দ্রুত সম্প্রসারণশীল বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিগুলো প্রায়ই মুনাফার বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করে, ফলে তারা তুলনামূলক কম লভ্যাংশ দেয়।

তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাস্তবতা ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এখনো লভ্যাংশকে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই কোনো কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে কম লভ্যাংশ দিলে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হন, যা শেয়ারের বাজারদরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাধ্যতামূলক লভ্যাংশ নীতির পক্ষে না হলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাবকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হবে।— ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম

ডিবিএ সভাপতি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানি মুনাফা ধরে রাখলেও সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষে মূল্যায়ন করা কঠিন। ফলে মুনাফার একটি অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করা হলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি এর সুফল পান এবং তাদের স্বার্থও কিছুটা সুরক্ষিত হয়।তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি বাধ্যতামূলক লভ্যাংশ নীতির পক্ষে না হলেও বাংলাদেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় কম লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাবকে একটি গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ বলে মনে করছি। এ ধরনের ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকা/আর/এইচ

শেয়ার করুন

মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিলে গুনতে হবে বাড়তি কর

আপডেট: ১০:৫১:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ বিতরণে উৎসাহিত করতে নতুন কর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার। আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরে কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ওই ঘাটতির ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপের বিধান রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করা হলে অথবা শুধু স্টক লভ্যাংশ দিলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর আইনের সংশোধনী প্রস্তাবে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করতে পারেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ নতুন কর ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকবে। আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার বিধানটি কার্যকর হলে তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ নিয়মের ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা জমা রেখে কম নগদ লভ্যাংশ দিচ্ছে, তাদের ওপর শেয়ারহোল্ডারবান্ধব নীতি গ্রহণের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে অতিরিক্ত স্টক লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরে কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি কর-পরবর্তী নিট আয়ের ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করে, তাহলে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশের নির্ধারিত সীমা এবং প্রকৃত বিতরণ করা লভ্যাংশের মধ্যে যে পার্থক্য থাকবে, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে এ কর পরিশোধ না করলে উপকর কমিশনার নোটিশ দিয়ে শুনানির সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে কর নির্ধারণ করতে পারবেন।উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১০০ কোটি টাকা হলে অন্তত ৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে হবে। যদি কোম্পানিটি ২০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেয়, তাহলে বাকি ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি পূর্ববর্তী বছরের কর-পরিশোধিত নিট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি সংরক্ষিত আয়, তহবিল, সঞ্চিতি বা উদ্বৃত্তে স্থানান্তর করলে স্থানান্তরিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে করারোপ করা হতো। অর্থাৎ কর আরোপের ভিত্তি ছিল মুনাফা সংরক্ষণের পরিমাণ। নতুন ব্যবস্থায় সেই ভিত্তি পরিবর্তন করে সরাসরি লভ্যাংশ বিতরণের হারের সঙ্গে করকে যুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে, স্টক লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও আগামী অর্থবছরে কিছুটা পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ক্ষেত্রে নগদ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা বা শুধু স্টক লভ্যাংশ বিতরণ করলে স্টক লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে এ করের আওতার বাইরে রাখা হবে। তবে অন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ১০ শতাংশ কর বহাল থাকবে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কোম্পানিকে নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ দিতে বাধ্য করা আদর্শ নাও হতে পারে। সাধারণত একটি কোম্পানি কত লভ্যাংশ দেবে, সেটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্তের বিষয়। বিশেষ করে দ্রুত সম্প্রসারণশীল বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিগুলো প্রায়ই মুনাফার বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করে, ফলে তারা তুলনামূলক কম লভ্যাংশ দেয়।

তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাস্তবতা ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এখনো লভ্যাংশকে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই কোনো কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে কম লভ্যাংশ দিলে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হন, যা শেয়ারের বাজারদরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাধ্যতামূলক লভ্যাংশ নীতির পক্ষে না হলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাবকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হবে।— ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম

ডিবিএ সভাপতি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানি মুনাফা ধরে রাখলেও সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষে মূল্যায়ন করা কঠিন। ফলে মুনাফার একটি অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করা হলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি এর সুফল পান এবং তাদের স্বার্থও কিছুটা সুরক্ষিত হয়।তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি বাধ্যতামূলক লভ্যাংশ নীতির পক্ষে না হলেও বাংলাদেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় কম লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাবকে একটি গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ বলে মনে করছি। এ ধরনের ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকা/আর/এইচ