১২:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
লাভের খাতায় ২ কোটি টাকা, নগদে অর্ধেকও নয়

কৃষিবিদ সীডের মুনাফার মুখোশের আড়ালে পাওনার পাহাড়! (পর্ব-১)

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১২:০৬:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
  • / ১০১৭৫ বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এসএমই প্ল্যাটফর্মকে উদীয়মান উদ্যোক্তা ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির জন্য একটি বিকল্প বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত একাধিক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে এমন কিছু অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারী, বাজার বিশ্লেষক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কাগজে-কলমে মুনাফা বাড়ছে, কিন্তু সেই মুনাফার সমপরিমাণ নগদ অর্থ কোম্পানির হাতে আসছে না। আবার কোথাও বিক্রয় প্রায় স্থির থাকলেও গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- এসব আয় কতোটা বাস্তব, কতোটা টেকসই, আর কতোটা কেবল হিসাবের খাতায় আটকে থাকা সংখ্যা?

আরও পড়ুন: কাগুজে বিক্রি ওপর দাঁড়িয়ে কৃষিবিদ ফিডের মুনাফার প্রাসাদ!

এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে এসএমই খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি কৃষিবিদ সীড লিমিটেড। কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে এমন দুটি অসামঞ্জস্যতা সামনে এসেছে, যা শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সমাপ্ত বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে নানা আর্থিক অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে কোম্পানির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ- সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষিবিদ সীড লিমিটেড নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা সাত পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘোষিত মুনাফা ও অপারেটিং ক্যাশ ফ্লোর মধ্যে প্রায় ৯২ লাখ টাকার ব্যবধান রয়েছে। একই সময়ে কোম্পানির বিক্রয় আয় মাত্র ১.২২ শতাংশ বাড়লেও ট্রেড রিসিভেবল বা গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ বেড়েছে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ টাকা। দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হয়েছে, যা এখন বাজারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

আরও পড়ুন: ভয়ংকর সিন্ডিকেটের ফাঁদে ডমিনেজ স্টীলের বিনিয়োগকারীরা!

কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিবিদ সীডসের রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৬১ হাজার ২৩২ টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ টাকা। কোম্পানি এটিকে ইতিবাচক পারফরম্যান্স হিসেবে তুলে ধরেছে এবং পরিচালনা পর্ষদ তাদের প্রতিবেদনে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে।

কিন্তু আর্থিক প্রতিবেদনের গভীরে প্রবেশ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায়, কোম্পানির অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো বা পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭০ টাকা। অর্থ্যাৎ কোম্পানি কাগজে ২ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ টাকা লাভ দেখালেও তার মধ্যে ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৮ টাকা নগদ অর্থে রূপান্তরিত হয়নি। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোম্পানি যে লাভ দেখিয়েছে তার প্রায় অর্ধেক বাস্তবে কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণে মুনাফার চেয়ে নগদ প্রবাহ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদান, ঋণ পরিশোধ, নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ- সবকিছুই শেষ পর্যন্ত নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করে। ফলে যখন মুনাফা ও নগদ প্রবাহের মধ্যে এত বড় ব্যবধান তৈরি হয়, তখন সেটিকে সাধারণত “আর্নিং কোয়ালিটি রিস্ক” হিসেবে দেখা হয়।

আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস: অদক্ষ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় লোকসান ১৫ কোটি টাকা!

আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-৭ অনুযায়ী, কর পরবর্তী মুনাফা এবং অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো-এর মধ্যে ধারাবাহিক বড় অমিল থাকলে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে- দেখানো মুনাফা কি সত্যিই নগদে পরিণত হওয়ার মতো বাস্তব আয়, নাকি এর বড় অংশ বিভিন্ন হিসাবের খাতায় আটকে আছে?

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ অর্থবছর শেষে ট্রেড রিসিভ্যাবল দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৯ টাকা। আগের বছর একই খাতে ছিল ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ৭০ হাজার ৯৬ টাকা। অর্থ্যাৎ মাত্র এক বছরে পাওনা অর্থ বেড়েছে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ টাকা বা প্রায় ২৩.৫৮ শতাংশ।

এখানেই দেখা দেয় সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্যতা। কারণ একই সময়ে কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ১.২২ শতাংশ। কোম্পানির নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ওই বছর টার্নওভার বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১.২২ শতাংশ।  অর্থাৎ বিক্রয় আয় যেখানে প্রায় স্থির, সেখানে গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ কেন ২৩.৫৮ শতাংশ বেড়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ অবস্থায় বিক্রয় বৃদ্ধি ও রিসিভেবল বৃদ্ধির মধ্যে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকে। যদি বিক্রয় ১ বা ২ শতাংশ বাড়ে, তাহলে রিসিভেবলও কাছাকাছি হারে বাড়তে পারে। কিন্তু বিক্রয় যেখানে কার্যত স্থবির, সেখানে রিসিভেবল ২৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক এবং বিশেষ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোম্পানির পুরো বছরের বিক্রয় আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৬১ হাজার ২৩২ টাকা। কিন্তু বছরের শেষে গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৯ টাকা। অর্থ্যাৎ মোট বার্ষিক বিক্রয়ের প্রায় অর্ধেকের সমপরিমাণ অর্থ এখনও কোম্পানির হাতে পৌঁছেনি। একজন বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কোম্পানি কি নগদ বিক্রয় করছে, নাকি ক্রমশ পাওনা নির্ভর ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে?

আরও পড়ুন: প্রি-অপারেশনাল ‘ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স’-এ শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ!

এসব বিষয়ে জানতে বিজনেস জার্নালের পক্ষ থেকে কৃষিবিদ সীডের কোম্পানি সচিব গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আব্দুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে এই প্রতিবেদক সিএফও আব্দুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে আলোচনা সাপেক্ষে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গত ২১ এপ্রিল একাধিক প্রশ্ন সম্বলিত ম্যাসেজ পাঠানোর পর দীর্ঘদিনেও কোম্পানির পক্ষ থেকে কোন ব্যাখ্যা বা উত্তর দেয়া হয়নি।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আমরা যখন কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনি, তখন ইপিএস আর লাভের অঙ্ক দেখি। কিন্তু পরে যদি দেখা যায় সেই লাভ নগদে আসেনি, তাহলে আমাদের জন্য সেটা কাগুজে লাভ ছাড়া আর কিছু নয়। কোম্পানি যদি সত্যিই এত বিক্রি করে থাকে, তাহলে টাকা কোথায়? তারা বলেন, রেভিনিও ১ শতাংশ বাড়ে আর পাওনা ২৩ শতাংশ বাড়ে- এটা কীভাবে সম্ভব? কোম্পানির উচিত বাজারকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া। কারণ এই টাকা আদায় না হলে ভবিষ্যতে মুনাফার ওপরও চাপ পড়বে।

আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএফআরএস-১৫ অনুযায়ী কোনো বিক্রয় থেকে আয় স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই অর্থ আদায়ের যৌক্তিক নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যখন রিসিভেবল দ্রুত বাড়তে থাকে এবং নগদ প্রবাহ দুর্বল থাকে, তখন কালেক্টেবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, কোম্পানি হয়তো অতিরিক্ত ক্রেডিটে পণ্য বিক্রি করছে। দ্বিতীয়ত, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া দুর্বল হতে পারে। তৃতীয়ত, কিছু বিক্রয়ের অর্থ আদায় অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে পারে। যদিও এসব সম্ভাবনার কোনোটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তবে আর্থিক প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

আরও পড়ুন: উল্টোরথে নাভানা ফার্মার আয়: সুদের যাঁতাকলে পিষ্ট বিনিয়োগকারীরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্বনামধন্য মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন প্রফিট বাড়ে কিন্তু ক্যাশ ফ্লো একই গতিতে বাড়ে না, তখন আমরা প্রথমে রিসিভ্যাবল দেখি। এখানে রিসিভ্যাবলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ক্যাশ ফ্লো-এর দুর্বলতা একই দিকে ইঙ্গিত করছে। তাই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।’

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কর্মকর্তা বার্ষিক প্রতিবেদনে ঘোষণা দিয়েছেন যে আর্থিক বিবরণী আইএফআরএস ও আইএএস অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এতে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য নেই। এছাড়া একই প্রতিবেদনে অডিট কমিটিও দাবি করেছে যে তারা কোনো জালিয়াতি, অনিয়ম বা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি খুঁজে পায়নি।

আরও পড়ুন: ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় বাড়লেও কমছে লাভ: লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ!

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সবকিছু এতোটাই শক্তিশালী ও স্বচ্ছ হয়ে থাকে, তাহলে মুনাফা ও নগদ প্রবাহের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন? আর রেভিনিও প্রায় অপরিবর্তিত থাকার পরও রিসিভ্যাবল কয়েক কোটি টাকা বৃদ্ধি পেল কীভাবে?

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এসএমই প্ল্যাটফর্মে তথ্যপ্রবাহ সীমিত হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা আর্থিক প্রতিবেদনের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন। তাই এই ধরনের অসামঞ্জস্যতা বাজারের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যখন আর্থিক বিবরণীর সংখ্যা দেখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন, তখন এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বলছেন, এসএমই মার্কেটে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তথ্যের সীমাবদ্ধতা। ফলে কোনো কোম্পানির রিসিভ্যাবল হঠাৎ কয়েক কোটি টাকা বেড়ে গেলে বা মুনাফা ও ক্যাশ ফ্লো-এর মধ্যকার গ্যাপ তৈরি হলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হই।

আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শেয়ারবাজারে আমরা কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিনিয়োগ করি। কিন্তু যদি কাগজে লাভ দেখিয়ে বাস্তবে নগদ অর্থ না আসে, তাহলে সেটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার সামিল। কৃষিবিদ ফিডের প্রতিবেদনে যেভাবে বকেয়া পাওনা বেড়েছে আর নগদ প্রবাহ ধসে পড়েছে, তাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো- এই লাভ বাস্তব, নাকি শুধু হিসাবের খাতায় তৈরি করা সংখ্যা?’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার সংকট। যদি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বদলে সাজানো মুনাফার ছবি তুলে ধরে, তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কৃষিবিদ সীডের মতো কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন এখন শুধু একটি কোম্পানির বিষয় নয়, এটি পুরো বাজার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।’

আরও পড়ুন: ইনডেক্স অ্যাগ্রোর ‘লাভের গল্প’: আটকে গেছে শ্রমিকদের পাওনা! 

বিএসইসির সাবেক একজন কমিশনার প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যদি রেভিনিও গ্রোথ ও রিসিভ্যাবল গ্রোথের মধ্যে এতো বড় বৈষম্য থাকে, তাহলে সেটি বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ বাজারের স্বচ্ছতা রক্ষা করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব। তার মতে, ‘কৃষিবিদ সীডের আর্থিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন দুটি। প্রথমত, ২ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ টাকা লাভ দেখানো হলেও কেন পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থ এসেছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭০ টাকা? এই ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৮ টাকা কোথায় আটকে আছে? দ্বিতীয়ত, রেভিনিও মাত্র ১.২২ শতাংশ বাড়লেও কেন ট্রেড রিসিভ্যাবল ২৩.৫৮ শতাংশ বেড়েছে? অতিরিক্ত ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ টাকা কি ভবিষ্যতে পুরোপুরি আদায়যোগ্য, নাকি এর একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!

সবশেষে বাজার এখন এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রত্যাশা করছে। কারণ পুঁজিবাজারে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে স্বচ্ছতা, নগদ প্রবাহের শক্তি এবং আয় ঘোষণার বাস্তবতা। কৃষিবিদ সীডের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারী ও বাজারের সামনে এই প্রশ্নগুলোর কতটা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে। যদি তারা তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কাগজে দেখানো মুনাফার চেয়ে অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে আস্থার- আর পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতার মূল্য প্রায়ই কোটি টাকার হিসাবকে ছাড়িয়ে যায়। (চলবে…)

শেয়ার করুন

লাভের খাতায় ২ কোটি টাকা, নগদে অর্ধেকও নয়

কৃষিবিদ সীডের মুনাফার মুখোশের আড়ালে পাওনার পাহাড়! (পর্ব-১)

আপডেট: ১২:০৬:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এসএমই প্ল্যাটফর্মকে উদীয়মান উদ্যোক্তা ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির জন্য একটি বিকল্প বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত একাধিক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে এমন কিছু অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারী, বাজার বিশ্লেষক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কাগজে-কলমে মুনাফা বাড়ছে, কিন্তু সেই মুনাফার সমপরিমাণ নগদ অর্থ কোম্পানির হাতে আসছে না। আবার কোথাও বিক্রয় প্রায় স্থির থাকলেও গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- এসব আয় কতোটা বাস্তব, কতোটা টেকসই, আর কতোটা কেবল হিসাবের খাতায় আটকে থাকা সংখ্যা?

আরও পড়ুন: কাগুজে বিক্রি ওপর দাঁড়িয়ে কৃষিবিদ ফিডের মুনাফার প্রাসাদ!

এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে এসএমই খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি কৃষিবিদ সীড লিমিটেড। কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে এমন দুটি অসামঞ্জস্যতা সামনে এসেছে, যা শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির সর্বশেষ ২০২৪-২৫ সমাপ্ত বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে নানা আর্থিক অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে কোম্পানির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ- সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষিবিদ সীড লিমিটেড নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা সাত পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘোষিত মুনাফা ও অপারেটিং ক্যাশ ফ্লোর মধ্যে প্রায় ৯২ লাখ টাকার ব্যবধান রয়েছে। একই সময়ে কোম্পানির বিক্রয় আয় মাত্র ১.২২ শতাংশ বাড়লেও ট্রেড রিসিভেবল বা গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ বেড়েছে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ টাকা। দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হয়েছে, যা এখন বাজারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

আরও পড়ুন: ভয়ংকর সিন্ডিকেটের ফাঁদে ডমিনেজ স্টীলের বিনিয়োগকারীরা!

কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিবিদ সীডসের রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৬১ হাজার ২৩২ টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ টাকা। কোম্পানি এটিকে ইতিবাচক পারফরম্যান্স হিসেবে তুলে ধরেছে এবং পরিচালনা পর্ষদ তাদের প্রতিবেদনে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে।

কিন্তু আর্থিক প্রতিবেদনের গভীরে প্রবেশ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায়, কোম্পানির অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো বা পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭০ টাকা। অর্থ্যাৎ কোম্পানি কাগজে ২ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ টাকা লাভ দেখালেও তার মধ্যে ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৮ টাকা নগদ অর্থে রূপান্তরিত হয়নি। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোম্পানি যে লাভ দেখিয়েছে তার প্রায় অর্ধেক বাস্তবে কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণে মুনাফার চেয়ে নগদ প্রবাহ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদান, ঋণ পরিশোধ, নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ- সবকিছুই শেষ পর্যন্ত নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করে। ফলে যখন মুনাফা ও নগদ প্রবাহের মধ্যে এত বড় ব্যবধান তৈরি হয়, তখন সেটিকে সাধারণত “আর্নিং কোয়ালিটি রিস্ক” হিসেবে দেখা হয়।

আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস: অদক্ষ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় লোকসান ১৫ কোটি টাকা!

আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-৭ অনুযায়ী, কর পরবর্তী মুনাফা এবং অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো-এর মধ্যে ধারাবাহিক বড় অমিল থাকলে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে- দেখানো মুনাফা কি সত্যিই নগদে পরিণত হওয়ার মতো বাস্তব আয়, নাকি এর বড় অংশ বিভিন্ন হিসাবের খাতায় আটকে আছে?

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ অর্থবছর শেষে ট্রেড রিসিভ্যাবল দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৯ টাকা। আগের বছর একই খাতে ছিল ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ৭০ হাজার ৯৬ টাকা। অর্থ্যাৎ মাত্র এক বছরে পাওনা অর্থ বেড়েছে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ টাকা বা প্রায় ২৩.৫৮ শতাংশ।

এখানেই দেখা দেয় সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্যতা। কারণ একই সময়ে কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ১.২২ শতাংশ। কোম্পানির নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ওই বছর টার্নওভার বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১.২২ শতাংশ।  অর্থাৎ বিক্রয় আয় যেখানে প্রায় স্থির, সেখানে গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ কেন ২৩.৫৮ শতাংশ বেড়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ অবস্থায় বিক্রয় বৃদ্ধি ও রিসিভেবল বৃদ্ধির মধ্যে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকে। যদি বিক্রয় ১ বা ২ শতাংশ বাড়ে, তাহলে রিসিভেবলও কাছাকাছি হারে বাড়তে পারে। কিন্তু বিক্রয় যেখানে কার্যত স্থবির, সেখানে রিসিভেবল ২৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক এবং বিশেষ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোম্পানির পুরো বছরের বিক্রয় আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৬১ হাজার ২৩২ টাকা। কিন্তু বছরের শেষে গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৯ টাকা। অর্থ্যাৎ মোট বার্ষিক বিক্রয়ের প্রায় অর্ধেকের সমপরিমাণ অর্থ এখনও কোম্পানির হাতে পৌঁছেনি। একজন বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কোম্পানি কি নগদ বিক্রয় করছে, নাকি ক্রমশ পাওনা নির্ভর ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে?

আরও পড়ুন: প্রি-অপারেশনাল ‘ফ্লাই ঢাকা এয়ারলাইন্স’-এ শাশা ডেনিমসের বিনিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ!

এসব বিষয়ে জানতে বিজনেস জার্নালের পক্ষ থেকে কৃষিবিদ সীডের কোম্পানি সচিব গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আব্দুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে এই প্রতিবেদক সিএফও আব্দুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে আলোচনা সাপেক্ষে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গত ২১ এপ্রিল একাধিক প্রশ্ন সম্বলিত ম্যাসেজ পাঠানোর পর দীর্ঘদিনেও কোম্পানির পক্ষ থেকে কোন ব্যাখ্যা বা উত্তর দেয়া হয়নি।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আমরা যখন কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনি, তখন ইপিএস আর লাভের অঙ্ক দেখি। কিন্তু পরে যদি দেখা যায় সেই লাভ নগদে আসেনি, তাহলে আমাদের জন্য সেটা কাগুজে লাভ ছাড়া আর কিছু নয়। কোম্পানি যদি সত্যিই এত বিক্রি করে থাকে, তাহলে টাকা কোথায়? তারা বলেন, রেভিনিও ১ শতাংশ বাড়ে আর পাওনা ২৩ শতাংশ বাড়ে- এটা কীভাবে সম্ভব? কোম্পানির উচিত বাজারকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া। কারণ এই টাকা আদায় না হলে ভবিষ্যতে মুনাফার ওপরও চাপ পড়বে।

আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএফআরএস-১৫ অনুযায়ী কোনো বিক্রয় থেকে আয় স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই অর্থ আদায়ের যৌক্তিক নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যখন রিসিভেবল দ্রুত বাড়তে থাকে এবং নগদ প্রবাহ দুর্বল থাকে, তখন কালেক্টেবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, কোম্পানি হয়তো অতিরিক্ত ক্রেডিটে পণ্য বিক্রি করছে। দ্বিতীয়ত, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া দুর্বল হতে পারে। তৃতীয়ত, কিছু বিক্রয়ের অর্থ আদায় অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে পারে। যদিও এসব সম্ভাবনার কোনোটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তবে আর্থিক প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

আরও পড়ুন: উল্টোরথে নাভানা ফার্মার আয়: সুদের যাঁতাকলে পিষ্ট বিনিয়োগকারীরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্বনামধন্য মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন প্রফিট বাড়ে কিন্তু ক্যাশ ফ্লো একই গতিতে বাড়ে না, তখন আমরা প্রথমে রিসিভ্যাবল দেখি। এখানে রিসিভ্যাবলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ক্যাশ ফ্লো-এর দুর্বলতা একই দিকে ইঙ্গিত করছে। তাই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।’

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কর্মকর্তা বার্ষিক প্রতিবেদনে ঘোষণা দিয়েছেন যে আর্থিক বিবরণী আইএফআরএস ও আইএএস অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এতে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য নেই। এছাড়া একই প্রতিবেদনে অডিট কমিটিও দাবি করেছে যে তারা কোনো জালিয়াতি, অনিয়ম বা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি খুঁজে পায়নি।

আরও পড়ুন: ইস্টার্ন ব্যাংকের আয় বাড়লেও কমছে লাভ: লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ!

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সবকিছু এতোটাই শক্তিশালী ও স্বচ্ছ হয়ে থাকে, তাহলে মুনাফা ও নগদ প্রবাহের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন? আর রেভিনিও প্রায় অপরিবর্তিত থাকার পরও রিসিভ্যাবল কয়েক কোটি টাকা বৃদ্ধি পেল কীভাবে?

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এসএমই প্ল্যাটফর্মে তথ্যপ্রবাহ সীমিত হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা আর্থিক প্রতিবেদনের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন। তাই এই ধরনের অসামঞ্জস্যতা বাজারের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যখন আর্থিক বিবরণীর সংখ্যা দেখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন, তখন এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বলছেন, এসএমই মার্কেটে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তথ্যের সীমাবদ্ধতা। ফলে কোনো কোম্পানির রিসিভ্যাবল হঠাৎ কয়েক কোটি টাকা বেড়ে গেলে বা মুনাফা ও ক্যাশ ফ্লো-এর মধ্যকার গ্যাপ তৈরি হলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হই।

আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শেয়ারবাজারে আমরা কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিনিয়োগ করি। কিন্তু যদি কাগজে লাভ দেখিয়ে বাস্তবে নগদ অর্থ না আসে, তাহলে সেটি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার সামিল। কৃষিবিদ ফিডের প্রতিবেদনে যেভাবে বকেয়া পাওনা বেড়েছে আর নগদ প্রবাহ ধসে পড়েছে, তাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো- এই লাভ বাস্তব, নাকি শুধু হিসাবের খাতায় তৈরি করা সংখ্যা?’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার সংকট। যদি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বদলে সাজানো মুনাফার ছবি তুলে ধরে, তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কৃষিবিদ সীডের মতো কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন এখন শুধু একটি কোম্পানির বিষয় নয়, এটি পুরো বাজার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।’

আরও পড়ুন: ইনডেক্স অ্যাগ্রোর ‘লাভের গল্প’: আটকে গেছে শ্রমিকদের পাওনা! 

বিএসইসির সাবেক একজন কমিশনার প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যদি রেভিনিও গ্রোথ ও রিসিভ্যাবল গ্রোথের মধ্যে এতো বড় বৈষম্য থাকে, তাহলে সেটি বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ বাজারের স্বচ্ছতা রক্ষা করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব। তার মতে, ‘কৃষিবিদ সীডের আর্থিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন দুটি। প্রথমত, ২ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ টাকা লাভ দেখানো হলেও কেন পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থ এসেছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭০ টাকা? এই ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৮ টাকা কোথায় আটকে আছে? দ্বিতীয়ত, রেভিনিও মাত্র ১.২২ শতাংশ বাড়লেও কেন ট্রেড রিসিভ্যাবল ২৩.৫৮ শতাংশ বেড়েছে? অতিরিক্ত ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ টাকা কি ভবিষ্যতে পুরোপুরি আদায়যোগ্য, নাকি এর একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!

সবশেষে বাজার এখন এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রত্যাশা করছে। কারণ পুঁজিবাজারে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে স্বচ্ছতা, নগদ প্রবাহের শক্তি এবং আয় ঘোষণার বাস্তবতা। কৃষিবিদ সীডের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারী ও বাজারের সামনে এই প্রশ্নগুলোর কতটা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে। যদি তারা তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কাগজে দেখানো মুনাফার চেয়ে অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে আস্থার- আর পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতার মূল্য প্রায়ই কোটি টাকার হিসাবকে ছাড়িয়ে যায়। (চলবে…)